বাংলাদেশিদের ব্রাজিল আর্জেন্টিনার প্রেমে মাতোয়ারার নেপথ্যে কী?

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

বাংলাদেশিদের ব্রাজিল আর্জেন্টিনার প্রেমে মাতোয়ারার নেপথ্যে কী?

ফন্ট সাইজ:

শূন্য দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের কুলকান্দি গ্রামে বেড়ে ওঠেন শহিদুল পার্থ। সে সময় বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই তাদের বাড়ি যেন পুরো গ্রামের মিলনমেলায় পরিণত হতো। গ্রামের ৮০ জনেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়ির উঠানে জড়ো হয়ে মাত্র ১৪ ইঞ্চির একটি সাদা-কালো টেলিভিশনে বিশ্বকাপের ম্যাচ উপভোগ করতেন। ব্যাটারিচালিত সেই টেলিভিশনটি ছিল আশপাশের এলাকায় হাতেগোনা কয়েকটি টিভির একটি। ম্যাচ চলাকালে সেই সময় তারা দুধ-চা আর বিস্কুট খেতে খেতে উত্তেজনা সামলাতেন। আর ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা গোল করলেই আনন্দধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠতো পুরো উঠোন।
৩৫ বছর বয়সী শহিদুল পার্থ সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, সেটা ছিল অসাধারণ এক সময়। মনে হতো, দর্শকরাও যেন মাঠের খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলছেন।

বর্তমানে শহিদুল যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের হ্যাটফিল্ডে বসবাস করেন। পেশায় তিনি একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী। পাশাপাশি হ্যাটফিল্ড টাউনশিপ এবং আরও কয়েকটি স্থানীয় সরকারের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্বকাপের সেই স্মৃতি বর্ণনা করে শহিদুল বলেন, গোল হলেই সবাই জোরে চিৎকার করে উঠতেন। সবাই ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। কেউ চিৎকার করে বলতেন, ‘যাও, যাও, গোল করো।’ আবার কেউ খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে নির্দেশনাও দিতেন- ‘এদিকে যাও, ওদিকে যাও।’

বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসবাস করলেও শহিদুল পার্থ এখনো ব্রাজিলেরই সমর্থক। তার ভাষায়, ব্রাজিলকে সমর্থন করা এক অর্থে তাকে নিজের শিকড় ও দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়।
যদিও বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল কখনোই ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, তবুও ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনায় এতটুকু ভাটা পড়েনি।
১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দক্ষিণ এশীয় দেশটি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল- এই দুই ফুটবল পরাশক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক।

বাংলাদেশে ফুটবলের এই উন্মাদনার প্রতিফলন দেখা যায় দর্শকসংখ্যাতেও। গত ১৬ই জুন আর্জেন্টিনার উদ্বোধনী ম্যাচের লাইভ ব্লগে বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের মোট পাঠকের প্রায় ২০ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশ থেকে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্রাজিলের এক নিবেদিত সমর্থক ব্রাজিলের জাতীয় পতাকার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে নিজের পুরো বাড়ি সবুজ ও হলুদ রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন। শুধু তাই নয়, বাড়ির সামনের দেয়ালে ফুটবল তারকাদের বিশাল ম্যুরালও এঁকেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অনেকেই বলেন, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল দলগুলোকে সমর্থন করার মাধ্যমে তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এক ধরনের গভীর সংযোগ অনুভব করেন। একই সঙ্গে এটি তাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও শিকড়ের স্মৃতিও জাগিয়ে তোলে।
১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সমপ্রচার অবকাঠামোর উন্নয়ন শুরু হয়। সেই সময় থেকেই বাংলাদেশে ব্রাজিলের প্রতি সমর্থনের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
সত্তরের দশকে ফুটবল কিংবদন্তি পেলের আন্তর্জাতিক খ্যাতি যখন তুঙ্গে, তখন নবগঠিত বাংলাদেশের মানুষ ব্রাজিলের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেন।

নতুন স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশিরা উপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা ব্রাজিলের মানুষের সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক মিল খুঁজে পান। একই সঙ্গে দারিদ্র্যকে জয় করে পেলের বিশ্বজয়ের গল্পও তাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি মেহেদী ফারহানা স্মরণ করেন, ১৯৮০-এর দশকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তার ইতিহাসের পাঠ্য বইয়ে পেলের শৈশবের দারিদ্র্য, সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছিল।
৪৮ বছর বয়সী মেহেদী ফারহানা বলেন, তখন আমরা ছিলাম একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ। আমাদের সম্পদ ছিল সীমিত, কিন্তু আমরা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম যে, আমরাও পারি।

বাংলাদেশে জন্ম নেয়া ফারহানা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার হ্যাটফিল্ডে বসবাস করেন এবং একজন অ্যাসোসিয়েট ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ও তার পরিবারের সবাই আজীবন ব্রাজিলের সমর্থক।
ফারহানা স্মৃতিচারণ করে বলেন, বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার সময় বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলা দেখার জন্য তিনি মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনের সামনে বসতেন।
তিনি জানান, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা অনেক মানুষ ব্রাজিলের আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেতেন।
ফারহানা বলেন, তাদের অবস্থাও আমাদের মতোই ছিল। তারা দরিদ্র ছিল, তাদেরও খুব বেশি সম্পদ ছিল না। কিন্তু তারপরও তারা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে যে, তারাও সফল হতে পারে।
আশির দশকে বাংলাদেশে রঙিন টেলিভিশনের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রথমবারের মতো সরাসরি ফিফা বিশ্বকাপ সমপ্রচার করলে অধিকাংশ বাংলাদেশি প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে বিশ্বকাপ উপভোগ করার সুযোগ পান।

সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েন বাংলাদেশের দর্শকরা। আর সেই মুগ্ধতাই ধীরে ধীরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এবং দেশ থেকে দেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়া এক দীর্ঘস্থায়ী ফুটবল-উন্মাদনা ও সাংস্কৃতিক আবেগে পরিণত হয়।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল। যে ইংল্যান্ড প্রায় ২০০ বছর ধরে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডসহ ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসন চালিয়েছিল।
সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা তার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি করেন, যা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরাও আজও সেই গোলের গল্প উচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্মরণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের লং আইল্যান্ডে বসবাসরত ৪০ বছর বয়সী বাংলাদেশি-আমেরিকান অনিক্স চৌধুরী বলেন, একসময় যেসব দেশ অন্যদের শাসন করেছিল ফুটবলের এসব বড় তারকা সেই শক্তিগুলোকেই পরাজিত করছিলেন।
তিনি বলেন, ফুটবল ম্যাচে এমন জয় মানুষের হৃদয়ে গভীর আবেগ তৈরি করেছিল। বিশেষ করে যেসব জাতি ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা বহন করে, তাদের কাছে এই জয় কেবল একটি খেলার ফল ছিল না, বরং আত্মমর্যাদা ও বিজয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
অনিক্স চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মধ্যে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট প্রজন্মগত বিভাজন রয়েছে। তার নিকট পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক হলেও, মায়ের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা ব্রাজিলকে সমর্থন করেন।

তিনি বলেন, বয়োজ্যেষ্ঠরা সব সময় পেলের কথা বলেন, কারণ সত্তর দশক ছিল পেলের যুগ। এরপর ১৯৮০-এর দশকে আসে ম্যারাডোনার সময়। আর এখন স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রজন্ম লিওনেল মেসির যুগের সঙ্গে বড় হয়েছে। তাই প্রজন্মের সঙ্গে সঙ্গে সমর্থনের এই ধারা বদলেছে।
নিউ ইয়র্ক সিটির বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ বাংলাদেশি-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর আবাস নিউ জার্সির প্যাটারসন শহর। সেখানে গড়ে ওঠা বাংলাদেশি-আমেরিকানদের একটি স্থানীয় ফুটবল দলের বেশির ভাগ সদস্যই আর্জেন্টিনার সমর্থক।
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশি আমেরিকান স্পোর্টস লিগ’-এ এখন পর্যন্ত ১৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সী শত শত তরুণ অংশ নিয়েছেন।
দক্ষিণ আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সম্পর্কে লিগের সাধারণ সম্পাদক মনসুর লতিফ বলেন, বাংলাদেশিদের কাছে এটা শুধু একটি দলের সমর্থন নয়, বরং একটি আবেগ।
তিনি বলেন, তারা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে অন্য কোনো দেশের দল হিসেবে দেখি না। তাদের সঙ্গে কথা বললে মনে হবে, যেন দলটি ‘আমাদেরই’। যদিও আমাদের কেউই ওই দেশগুলোর বাসিন্দা নই বা সেখানে যাইনি, তবুও এই আবেগ সব সময়ই আমাদের মধ্যে কাজ করে।

৩৪ বছর বয়সী প্রকৌশলী মনসুর লতিফ নিজেকে আর্জেন্টিনার ‘কট্টর সমর্থক’ বলে পরিচয় দেন। আকাশি-সাদা জার্সির প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। পাশাপাশি শৈশবে ভাইদের সঙ্গে বসে আর্জেন্টিনার খেলা দেখার স্মৃতিও তিনি আজও সযত্নে লালন করেন।
লতিফ বলেন, আর্জেন্টিনার খেলার ধরনই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে। তাদের খেলায় সবকিছুই যেন নিখুঁত।
বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকান সমপ্রদায়ের সদস্যরা নিজেদের বাড়িতে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ ঘিরে নিয়মিত ‘ওয়াচ পার্টি’ বা খেলা দেখার আয়োজন করেন।
তবে নিজে আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক হলেও, ১৯শে জুন বন্ধুর বাড়িতে আয়োজিত এক ওয়াচ পার্টিতে হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন লতিফ।
মনসুর লতিফ ও অনিক্স চৌধুরী- দুজনেরই জন্ম ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের পর। তবে ছোটবেলা থেকেই তারা দিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্যের গল্প এমনভাবে শুনে বড় হয়েছেন, যেন সেটি তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যেরই একটি অংশ।
এখন অনিক্স চৌধুরী সেই ফুটবলপ্রেমের উত্তরাধিকার নিজের ছোট ছেলের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চান। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, আমার ছেলেকেও এই সমর্থনে জড়িয়ে ফেলছি।

মাত্র এক বছর বয়সী ছেলেকে তিনি নিয়মিত আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে ছবি তোলেন, যেন নতুন প্রজন্মের আরেক আর্জেন্টিনা সমর্থকের সূচনা হয়।
অনিক্স চৌধুরীর ভাষায়, এই ফুটবল-সমর্থনের মধ্যদিয়েই নিজের শিকড়, নিজের জন্মভূমির সঙ্গে এক ধরনের গভীর সংযোগ অনুভব করা যায়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন