জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত হত্যা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (খিলগাঁও জোন) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই মামলায় এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এএসআই চঞ্চল (তদন্ত) চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। রোববার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মামলার পটভূমি: মামলায় ৫ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তাদের মধ্যে চঞ্চল চন্দ্র সরকার ছাড়া বাকি ৪ জন পলাতক। মামলার ভুক্তভোগী ছিলেন নাদিম, মায়া ইসলাম ও আমির হোসেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন এবং আমির হোসেন গুরুতর আহত হন। নির্মাণাধীন ভবনের রড ধরে ঝুলে থাকা অবস্থায় আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। একই ঘটনায় বাসিত খান মূসা নামে এক কিশোর নিজ বাসার কলাপসিবল গেটের ভেতরে গুরুতর আহত হয়।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ: রায়ের শুরুতে ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর এখতিয়ার, বৈধতা ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। রায়ে বলা হয়, সংবিধান অনুযায়ী আইসিটি আইনের বিধান অন্যান্য আইনের ওপর প্রাধান্য পায় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা রোম সংবিধির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আসামিদের ন্যায়বিচারের সব ধরনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। পলাতক ৪ আসামির পক্ষেও আইনজীবী নিয়োগ করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে আটক আসামিদের চিকিৎসক ও আইনজীবীর উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং স্বজনদেরও কাছাকাছি থাকার সুযোগ দেয়া হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ১৪ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। আসামিপক্ষের সাক্ষী ছিলেন আটক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার, যিনি নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দেন। ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য-প্রমাণের পাশাপাশি জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা, বিবিসি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অধিকার, টেকনো গ্লোবাল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রতিবেদন, অডিও-ভিডিও, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, পুলিশি নথি ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে।
জুলাই আন্দোলন নিয়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ: রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১লা জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত চলা ছাত্র আন্দোলনের সময় ১৪ই জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্য এবং পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। ১৬ই জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের পর ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়ারলেস বার্তার মাধ্যমে অধস্তন পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেন।
আসামিদের ভূমিকা: ট্রাইব্যুনাল বলেন, হাবিবুর রহমান সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেন। ঘটনার পর ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান রামপুরা থানায় গিয়ে ওসি মশিউর রহমানকে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেন। অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার রাশেদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অভিযান তদারকি করেন। ওসি মশিউর রহমান অভিযান পরিচালনা ও গুলিবর্ষণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রায়ে আরও বলা হয়, প্রাণ বাঁচাতে নির্মাণাধীন ভবনের রড ধরে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি করেন এএসআই চঞ্চল (তন্তু) চন্দ্র সরকার। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
রায়ের আদেশ: রায়ে আসামিদের দায়ও পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, এডিসি রাশেদুল ইসলাম ও ওসি মশিউর রহমানকে ৩টি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার প্রথম ও তৃতীয় অভিযোগ থেকে খালাস পেলেও দ্বিতীয় অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে এবং একই আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্তরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন।
বিচার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা: রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মোহাম্মদ ইসলাম, সৈয়দ হায়দার আলী, গাজী এমএইচ তামিম, ফজলুল ইসলাম জুয়েলসহ সংশ্লিষ্ট সব আইনজীবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে আসামিপক্ষের আইনজীবী, সাংবাদিক, ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ সদস্য, অপারেটর এবং বিচারকার্যে সহযোগিতা করা সাক্ষীদের প্রতিও ধন্যবাদ জানান ট্রাইব্যুনাল।
আসামিপক্ষের প্রতিক্রিয়া: রায়ের পর এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন বলেন, তারা রায়ে সন্তুষ্ট নন এবং আপিল বিভাগে যাবেন। তিনি দাবি করেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে একটি অতিরিক্ত বিচারবহির্ভূত স্বীকারোক্তি (এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশন) গ্রহণ করা হয়েছে, যা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ ছাড়া ঘটনার দিন চঞ্চল বাংলাদেশ টেলিভিশন কেন্দ্রে দায়িত্বে ছিলেন বলে কল ডিটেইল রেকর্ডে (সিডিআর) উল্লেখ রয়েছে। কেবল একটি ভিডিও’র ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া: রায়ের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি তৃতীয় রায় এবং এই রায়ের মাধ্যমে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। তিনি বলেন, ডিএমপি’র তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান বেতার বার্তার মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের পায়ে গুলি করার নির্দেশ দিলেও বাস্তবে বুকে ও মাথায় গুলি করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, আমির হোসেনকে গুলি করার ঘটনায় চঞ্চল চন্দ্র সরকার স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন এবং সেই স্বীকারোক্তি ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এটি একটি যথার্থ রায় এবং এর মাধ্যমে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ বিশ্বাস করে।
