ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। আর আর্জেন্টিনার ম্যাচ হলে তো কথাই নেই। গতকাল সকালে আর্জেন্টিনার ম্যাচের প্রাণবন্ত প্রতিচ্ছবি দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশটির সমর্থনে জোয়ার ওঠে টিএসসিতে। দলটির জার্সি-পতাকায় ভরে ওঠে ওই এলাকা। এ যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনা।
এদিন জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দাপুটে জয় তুলে নেয় লা আলবিসেলেস্তেরা। যদিও রাত থেকেই আকাশি-সাদা জার্সি-পতাকা নজরে আসে সর্বত্র। সকাল ৮টায় শুরু হয় গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচ। বড় দলের মতোই জয় তুলে নেয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। গোল পায় দলটির মধ্যমণি লিওনেল মেসি। প্রতিটি গোলের পরই দেখা যায় উচ্ছ্বাস। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই এই উদ্যাপন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। মুহূর্তেই টিএসসি পরিণত হয় এক টুকরো বুয়েনস আইরেসে।
ম্যাচ শুরুর অনেক আগ থেকেই টিএসসিতে ভিড় করতে থাকেন ফুটবলপ্রেমীরা। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের নিয়ে অনেকেই বড় পর্দার সামনে অবস্থান নেন। খেলা শুরুর আগে থেকেই চলতে থাকে ‘মেসি’, ‘আর্জেন্টিনা’ ধ্বনি। প্রিয় দলের জয়ে আশাবাদী সমর্থকদের চোখে-মুখে ছিল বাড়তি আত্মবিশ্বাস।
ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে দর্শকদের মধ্যে ছিল টানটান উত্তেজনা। আর্জেন্টিনার প্রতিটি আক্রমণে করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে টিএসসি। বল প্রতিপক্ষের জালে জড়াতেই একযোগে গর্জে ওঠেন হাজারো দর্শক। কেউ লাফিয়ে ওঠেন, কেউ বন্ধুদের জড়িয়ে ধরেন, কেউ আবার আনন্দে পতাকা উড়িয়ে দৌড়াতে শুরু করেন। প্রতিটি গোল যেন নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দেয় পুরো চত্বরে। গ্রুপ পর্বের শেষ খেলা হওয়ায় বেঞ্চের ফুটবলারদের আধিক্য ছিল বেশি। স্কলানি ৬০তম মিনিটে নামান প্রাণভোমরা মেসিকে। নিরাশ করেননি মেসি। প্রতিপক্ষের ডি বক্সের একটু সামনে থেকে চোখ ধাঁধানো ফ্রি কিকে গোল করেন তিনি। এই গোলের পর উচ্ছ্বাসের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তবে তালি শুধু আর্জেন্টাইনদের পক্ষেই পড়েনি। অন্য দলের সমর্থক বিশেষ করে ব্রাজিল ভক্তরা জর্ডানের গোল উদ্যাপন করেন। জর্ডানের দেয়া একমাত্র গোলের সময় তারা আর্জেন্টাইন ভক্তদের দেখিয়ে দেখিয়ে উল্লাস করেছেন। যদিও অ্যান্টি আর্জেন্টাইন ভক্তরা পুরো সময় জুড়েই কোণঠাসা ছিলেন।
খেলা শেষে শুরু হয় বিজয় মিছিল। আকাশি-সাদা পতাকা হাতে হাজার হাজার সমর্থক টিএসসি এলাকায় মিছিল করেন। ‘ভামোস আর্জেন্টিনা’, ‘কাম্পেওন’, ‘মেসি... মেসি’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক। কেউ নেচেছেন, কেউ গান গেয়েছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোনে সেই আনন্দঘন মুহূর্ত ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পুরো এলাকা যেন পরিণত হয় এক বিশাল ফুটবল উৎসবে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ক্যাম্পাসের টিএসসি, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল, কবি জসীমউদ্দীন হল, জগন্নাথ হল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলসহ বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন হলে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি ও অন্য দলের পতাকায় সেজে উঠেছে আবাসিক এলাকা। গড়ে উঠেছে হলভিত্তিক সমর্থক গোষ্ঠী। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে হয়েছে বর্ণাঢ্য র্যালি ও মিছিল। ফলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে বিশ্বকাপের আবহ এখন স্পষ্ট।
জর্ডানের বিপক্ষে এই জয় সেই উৎসবকে যেন আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে পা রেখেছে মেসিবাহিনী। ম্যাচ শেষে শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, আশপাশের বাসিন্দা এবং বিভিন্ন বয়সী ফুটবলপ্রেমীরাও টিএসসিতে এসে যোগ দেন।
সমর্থকদের মতে, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা যেন নতুন করে একটি ঠিকানা খুঁজে পায়। কয়েক দশক ধরে দেশের লাখো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে আকাশি-সাদা জার্সি। ডিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে লিওনেল মেসি- প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের আবেগে ভাটা পড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে।
