জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের চরম অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং চিকিৎসার নামে রোগীদের জীবন বিপন্ন করার এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সম্প্রতি একদিনে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার বিবরণ দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে সমস্ত নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে কীভাবে বাণিজ্যিক বেকারি কারখানা ও বিপজ্জনক প্লাস্টিক বর্জ্যরে স্তূপ গড়ে তোলা হয়েছে, তা সংসদের সামনে তুলে ধরেন মন্ত্রী। চিকিৎসা সেবার আড়ালে হাসপাতালের ভেতরে গড়ে ওঠা এমন বাণিজ্যিক মানসিকতাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা খাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অবহেলা সরকার বরদাশত করবে না।
তিনি বলেন, গত মে মাসে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চরম অবহেলা এবং অসতর্কতার কারণে ছয়টি মায়ের বুক খালি হয়েছে। হাইপারক্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যখন শিশুগুলোর হাত-পা কাঁপছিল, তখন সেখানে এসি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, কোনো সচল জানালা ছিল না এবং ছিল না কোনো জরুরি অক্সিজেন সাপোর্ট। ১৬ থেকে ১৭ জন মা যখন তাদের সন্তানদের বাঁচানোর জন্য চত্বরে কাঁদতে কাঁদতে ছোটাছুটি করছিলেন, তখন সেখানে কোনো অন-ডিউটি ডাক্তার পাওয়া যায়নি, এমনকি নার্সরাও ডাকলে সাড়া দেননি। কার্বন ডাই অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় ছটফট করতে করতে নিরীহ শিশুগুলো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ঘটনার পরদিনই নিজে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে এই গুরুতর অবহেলার প্রমাণ পেয়েছেন বলে সংসদকে অবহিত করেন মন্ত্রী। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এমন নির্মম ঘটনার পরও হাসপাতালের মালিকপক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো বা সান্ত্বনা দেয়ার ন্যূনতম নৈতিক সৌজন্যতা দেখাননি।
হাসপাতালের ভেতরের অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আদ্-দ্বীনের বাণিজ্যিক আকাক্সক্ষা এতটাই অনৈতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, ডাক্তার ও রোগী অবস্থান করছেন, সেখানে তারা হাসপাতালের ভেতরেই একটি বেকারি কারখানা গড়ে তুলেছে। এই বেকারি কারখানার ময়লা, স্তূপীকৃত প্লাস্টিক বর্জ্য এবং আশপাশের জমা জলবদ্ধতার কারণে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, যা থেকে নির্গত গ্যাস ও দূষণ শিশুদের মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
মন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে যেভাবে দাহ্য প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে রাখা হয়েছে, তাতে যেকোনো সময় একটি ছোট আগুন লাগলে সেখানে থাকা কোনো রোগী কিংবা তাদের অভিভাবক প্রাণ নিয়ে বের হতে পারবেন না। এই চরম অব্যবস্থাপনা ও লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত করেছে এবং বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সেখানে সরকারি তদারকিতে নতুন চিফ এক্সিকিউটিভ নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
