বিরতির পর শেষ রক্ষা করতে পারলো না পানামা। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে পরের হাফের দুই গোলেই ‘এল’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করলো ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই প্রথম টানা দুই আসরে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলো ইংলিশরা। এদিন ম্যাচের সব আলো কেড়ে নিয়েছেন থ্রি লায়ন্স অধিনায়ক হ্যারি কেইন। কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারকে টপকে বিশ্বমঞ্চে এখন তিনিই ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ম্যাচের ৬২ মিনিটে ডেডলক ভাঙেন জুড বেলিংহাম। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর, অর্থাৎ ৬৭ মিনিটে এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকার দুর্দান্ত ক্রস থেকেই দারুণ এক হেডে বল জালে জড়ান কেইন।
এটি বিশ্বকাপে কেইনের ১১তম গোল, যা লিনেকারের ১০ গোলের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। চলমান আসরে এটি কেইনের তৃতীয় গোল। এ জয়ের ফলে আগামী ১লা জুলাই আটলান্টায় শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (ডিআর) অব কঙ্গোর মুখোমুখি হবে থ্রি লায়নরা। তবে জয়ের রাতে ইংল্যান্ড শিবিরে কিছুটা অস্বস্তি বাড়িয়েছে ডিফেন্ডার জারেল কোয়ানসার চোট। ম্যাচ চলাকালীন মাঠ ছাড়তে হয় এই রাইট-ব্যাককে। রেকর্ড গড়ার পর কেইন বলেন, ‘এটি অবশ্যই অত্যন্ত গর্বের একটি মুহূর্ত। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বলেছিলাম, পেশাদার ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ আমাদের খেলা সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা। তাই এখানে ১১টি গোল করা সত্যিই গর্বের। এই মুহূর্তটি আমি দলের সঙ্গে উপভোগ করতে চাই। আমি এই অর্জনগুলোকে কখনো সহজভাবে নেই না।
আশা করি এই টুর্নামেন্টে এটাই আমার শেষ মাইলফলক নয়।’ কেইনের এই কীর্তিতে মুগ্ধ হয়ে লিনেকার নিজেই তাকে ‘ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সেরা স্ট্রাইকার’ বলে অবিহিত করেছেন। কোচ থমাস টুখেলও কেইনের এই রেকর্ডে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘হ্যারি শারীরিক ও মানসিকভাবে দারুণ অবস্থায় আছে। ও বিশ্বকাপে একদম শেষ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য ক্ষুধার্ত এবং কোনো কিছুতেই সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকার পাত্র নয়।’
অধিনায়কের প্রশংসায় পঞ্চমুখ দুই গোলেই অবদান রাখা বেলিংহামও। আইটিভি-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘হ্যারি কেইন ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। সে অন্য যেকোনো ইংলিশ ফুটবলারের চেয়ে দলের প্রয়োজনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। এই মুহূর্তে ও অবিশ্বাস্য এক লেভেলে আছে।
অধিনায়ক হিসেবে ওর পরিশ্রম এবং নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা অতুলনীয়। ওর যোগ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশই নেই, ওই সেরা।’
কেইনের রেকর্ডের রাতে রেকর্ডের পাতায় নাম লিখিয়েছেন ২২ বছর ৩৬৩ দিন বয়সী বেলিংহামও। গত ৬০ বছরে রজার হান্ট, জো কোল ও রাহিম স্টার্লিংয়ের পর চতুর্থ এবং কনিষ্ঠতম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের একই ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট করার কীর্তি গড়লেন তিনি। রেকর্ড আর পরিসংখ্যানের পাতায় কেইনের এই ম্যাচ যেন এক সোনার খনি। বায়ার্ন মিউনিখ স্ট্রাইকার কেইন এখন পর্যন্ত ৩টি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০১৮, ২০২২, ২০২৬) গোল করার কীর্তি গড়লেন, যা ডেভিড বেকহ্যামের পর মাত্র দ্বিতীয় ইংলিশ খেলোয়াড় হিসেবে নজির।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলে এবার দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন থ্রি লায়ন্স অধিনায়ক। ক্লাব ও দেশ মিলিয়ে এই মৌসুমে তার গোলসংখ্যা এখন অবিশ্বাস্য ৭০টি! বিশ্বকাপে একটি নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষের (পানামা) বিরুদ্ধে কেইনের গোল এখন ৪টি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বেশি গোল আছে কেবল ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের (৫)। এই গোলের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানির ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান এবং হাঙ্গেরির স্যান্ডর কোকসিসকেও (১১) ছুঁয়ে ফেলেছেন। কেইনের সামনে এখন সুযোগ মাত্র ১৬ ম্যাচে ১২ গোল করা ব্রাজিলের মহানায়ক পেলেকে ছুঁয়ে ফেলার।
পাশাপাশি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জেতার দৌড়েও ভালোভাবেই টিকে রইলেন কেইন। এখন পর্যন্ত ৬ গোল নিয়ে শীর্ষে আছেন লিওনেল মেসি। ৪ গোল নিয়ে ঠিক পেছনেই আছেন এমবাপ্পে, আর্লিং ব্রুট হালান্দ ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়ররা। বিপরীতে, টানা ৬টি বিশ্বকাপ ম্যাচ হেরে মেক্সিকো ও কানাডার পর ইতিহাসে ষষ্ঠ দল হিসেবে এই বিব্রতকর রেকর্ডে নাম লেখালো পানামা। একই সঙ্গে, ২০১০ সালের পর প্রথম দল হিসেবে গ্রুপ পর্বে কোনো গোল না করেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিলো সেন্ট্রাল আমেরিকান দেশটি।
