২৩শে জুন অনুষ্ঠিত নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচন ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই নির্বাচন কেবল নিউইয়র্কেই অনুষ্ঠিত হয়েছে, তবু এর প্রভাব সেই অঙ্গরাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। নির্বাচনের ফলাফল ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রগতিশীল রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সামনে এনেছে এবং মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের যুক্তরাষ্ট্রের জনজীবনে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভাবের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে।
সব মিলিয়ে এসব পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব এবং ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিতর্কের সীমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণাগুলো বদলাতে শুরু করেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন এক ধরনের বিশেষ সুরক্ষিত অবস্থান। যেসব প্রার্থী ইসরাইলকে দেয়া সামরিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, ইসরাইলি নীতির সমালোচনা করতেন অথবা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিতেন, তারা প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়তেন।
আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) মতো সংগঠনগুলো তহবিল সংগ্রহের নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে সেই সীমারেখা কার্যকর রাখত, যা সারা দেশে নির্বাচনের ফলাফলকেও প্রভাবিত করত। কিন্তু নিউইয়র্কের প্রাইমারি নির্বাচন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন বদলাতে শুরু করেছে। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের সমালোচক এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের সমর্থক কয়েকজন প্রগতিশীল প্রার্থী ডেমোক্রেটিক পার্টির মূলধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন।
তাদের এই জয় ডেমোক্রেট ভোটারদের মধ্যে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন, বিশেষ করে তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে, যাদের ইসরাইল ও ফিলিস্তিন বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি আগের প্রজন্মের তুলনায় স্পষ্টভাবে ভিন্ন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি দ্রুতই ডেমোক্রেটিক পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী উদীয়মান নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।
তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন, শ্রমিক জোট, ডিজিটাল প্রচারণা, স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সহযোগী প্রগতিশীল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মামদানি দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রগতিশীল রাজনীতিকে কার্যকর নির্বাচনী শক্তিতে রূপ দেয়া যায়। জুনের এই প্রাইমারি নির্বাচন সেই প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ব্র্যাড ল্যান্ডার কংগ্রেসের অন্যতম শক্তিশালী ইসরাইলপন্থী সদস্য ড্যান গোল্ডম্যানকে পরাজিত করেছেন। দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের দীর্ঘদিনের কংগ্রেস সদস্য আদ্রিয়ানো এসপাইয়াতকে হারিয়েছেন। ক্লেয়ার ভালদেজ ইসরাইলকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা পুনর্মূল্যায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজের মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন। আর সবচেয়ে প্রতীকী বিজয় এসেছে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান প্রার্থী আবের কাওয়াসের কাছ থেকে। তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেট-এর একটি আসনে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়া এখন আর আগের মতো রাজনৈতিক দায় নয়। এই বিজয়গুলোর মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে, তা শুধু মতাদর্শ নয়; বরং সংগঠিত রাজনৈতিক কার্যক্রম।
এসব প্রচারণা ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক যন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে মূলত তৃণমূলের আন্দোলন, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করেছে। তাদের এই সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির আরেকটি দীর্ঘদিনের ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে- যে ধারণা অনুযায়ী, কেবল অর্থই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে। আইপ্যাক এখনো ওয়াশিংটনের সবচেয়ে প্রভাবশালী লবিং সংগঠনগুলোর একটি এবং তাদের হাতে বিপুল আর্থিক সম্পদ রয়েছে। কিন্তু নিউইয়র্কের ফলাফল দেখিয়েছে, বিপুল অর্থ ব্যয় করলেই সব সময় বিজয় নিশ্চিত করা যায় না; বিশেষ করে যখন একটি শক্তিশালী তৃণমূল আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং ভোটাররা কোনো বিষয়কে স্পষ্ট নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করেন।
অনেক তরুণ আমেরিকানের কাছে গাজা এখন ঠিক এমনই একটি নৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান- সব মিলিয়ে ইসরাইলি সরকারের নীতির ওপর ক্রমবর্ধমান সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ক্রমেই আরও বেশি তরুণ ভোটার এসব বিষয়কে দূরবর্তী বৈদেশিক নীতির প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
নিউইয়র্কে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তার তাৎপর্য শুধু এই অঙ্গরাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেমোক্রেটিক পার্টিকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, সেগুলো একই সঙ্গে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণকেও ত্বরান্বিত করছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই সম্প্রদায়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এখন সেই ভারসাম্য বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে যুক্তরাষ্ট্রের সব স্তরের সরকারি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে রেকর্ডসংখ্যক মুসলিম ও আরব-আমেরিকান প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের অনেকেই সফল হচ্ছেন। কারণ তারা শুধু নিজ নিজ জাতিগত বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভোটের ওপর নির্ভর না করে বিস্তৃত ভোটার জোট গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। নিউ জার্সিতে মিশরীয়-আমেরিকান চিকিৎসক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা অ্যাডাম হামাওয়ি আরব ও মুসলিম ভোটারদের বাইরে আরও বিস্তৃত সমর্থন গড়ে তুলে কংগ্রেসের জন্য ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন।
অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সিনেটর আয়েশা ওয়াহাব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে জয় পেয়েছেন। এই ফলাফল দেখাচ্ছে, মুসলিম-আমেরিকান প্রার্থীদের এখন ক্রমেই মূলধারার রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা নানা ধরনের জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম। নিউইয়র্কের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভবত চলছে মিশিগানে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ আরব-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বসবাস। সেখানে চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং ডেট্রয়েটের সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক ড. আবদুল এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত তার প্রচারণা ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য গতি পেয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক তাকে এই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছেন।
যদি তিনি বিজয়ী হন, তবে তা শুধু আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেই নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে প্রগতিশীল রাজনীতির জন্যও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে। নিউইয়র্কে দেখা পরিবর্তনের সঙ্গে এসব প্রার্থিতার যে মিল রয়েছে, তা হলো- রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে শুধু দাবিদাওয়া উত্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতি ক্রমবর্ধমান বিশ্বাস।
মুসলিম ও আরব-আমেরিকানরা এখন ক্রমেই নির্বাচনী রাজনীতিকে শুধু প্রতিনিধিত্বের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং নীতি নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের কার্যকর উপায় হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
গাজার যুদ্ধ এই পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সারা দেশে বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠন জানিয়েছে, ভোটার নিবন্ধন, তহবিল সংগ্রহ, নতুন প্রার্থী খুঁজে বের করা এবং তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১১ সেপ্টেম্বরের (৯/১১) হামলার পরবর্তী সময় এবং এখন গাজার যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা একটি নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক হতাশাকে ক্রমশ নির্বাচনী প্রভাব ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তবে চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
মুসলিম ও আরব-আমেরিকান প্রার্থীদের এখনো তাদের ধর্ম, পরিচয় এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অতিরিক্ত নজরদারি ও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। একই সঙ্গে হয়রানি এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য (ডিসইনফরমেশন) ছড়িয়ে দেয়াও তাদের জন্য এখনো স্থায়ী বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তবে এখন আর এই চ্যালেঞ্জগুলোই পুরো গল্পকে সংজ্ঞায়িত করে না। বরং বড় গল্পটি হলো রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির।
নিউইয়র্কের বিজয়, প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং মুসলিম ও আরব-আমেরিকান প্রার্থীদের বাড়তে থাকা সাফল্য- সবই একই দিকে ইঙ্গিত করছে। এসব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, এমন নতুন ভোটারগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটছে, যারা আর ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু দাবি জানিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না; বরং তারা ক্ষমতার ভেতরে প্রবেশ করে সরাসরি তা প্রয়োগ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এসব পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে কতটা রূপান্তরিত করবে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট- যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যেসব কণ্ঠস্বর একসময় রাজনৈতিক প্রান্তিকতায় ঠেলে রাখা হয়েছিল, তারা এখন ধীরে ধীরে মূলধারার কেন্দ্রবিন্দুর দিকে এগিয়ে আসছে।
একই সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মার্কিন রাজনীতিকে পরিচালিত করা বহু প্রচলিত ধারণা নতুন এক ভোটারগোষ্ঠীর সামনে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। সম্ভবত ২০২৬ সালের সবচেয়ে স্থায়ী শিক্ষা এটিই হবে- শুধু এই নয় যে কিছু নতুন প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে, এবং তারা স্থায়ীভাবেই সেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলতে এসেছে।
