বিশ্বজুড়ে পরিচিত একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। শেয়ারবাজারে কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার (আইপিও) প্রস্তুতি নিয়ে তিনি দারুণ উচ্ছ্বসিত। এমন সময় তিনি সরকারকে সমালোচনা করে কিছু অবিবেচক মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া আসে এমনভাবে, যা কেউ কল্পনাও করেনি। এক রাতের মধ্যেই দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি খাত ও সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের অলিখিত সমঝোতা ভেঙে যায়।
আপনি যদি মনে করেন, এই গল্পটি অ্যানথ্রপিকে নিয়ে, তাহলে আপনি আংশিকভাবে ঠিক।
২০২০ সালে আলিবাবা[’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা প্রকাশ্যে চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমালোচনা করার পর সরকারের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন। নিয়ন্ত্রক উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষ অ্যান্ট গ্রুপের আইপিও বাতিল করে দেয়। জ্যাক মা এই কোম্পানিরও সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এরপর শুরু হয় কঠোর নিয়ন্ত্রক অভিযান, যার প্রভাব থেকে চীনের খুব কম প্রযুক্তি কোম্পানিই রেহাই পেয়েছিল।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারও যেন নিজেদের ‘জ্যাক মা মুহূর্ত’-এর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। অর্থাৎ এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে সরকার যেন প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব থেকে একজন প্রযুক্তি নেতাকে আঘাত করছে। সরকার ও অ্যানথ্রপিকের বর্তমান বিরোধ একসময় মিটে গেলেও, আগামী বহু বছর ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিকাশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়তো চীনের প্রতিযোগিতা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের আত্মঘাতী নীতিই হয়ে উঠতে পারে।
গত ৯ই জুন অ্যানথ্রপিক তাদের নতুন মডেল ফেবল ৫ প্রকাশ করে। এটি তাদের শক্তিশালী মিথোস মডেলের একটি অভিযোজিত সংস্করণ, যা সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত করার অসাধারণ সক্ষমতা রাখে। অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এমনকি বলেন, মিথোস ব্যবহারকারী অনেক প্রতিষ্ঠান এটিকে ‘সুপার অস্ত্র’ বলে অভিহিত করেছে।
এর মাত্র তিন দিন পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নির্দেশনা জারি করে, যাতে বিদেশি নাগরিক ও মার্কিন নন এমন নাগরিকদের- এমনকি অ্যানথ্রপিকের নিজস্ব কিছু কর্মীকেও ফেবল ৫ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এর ফলে অ্যানথ্রপিক মডেলটির সব ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘জেলব্রেক’-এর ঝুঁকি। অর্থাৎ কোনো এআই মডেল তার অন্তর্নির্মিত নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে ফেলা এবং বিদেশি প্রতিপক্ষের হাতে মডেলটি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র সরকার অ্যানথ্রপিককে মিথোসের একটি সংস্করণে কিছু ব্যবহারকারীর প্রবেশাধিকার পুনরুদ্ধারের অনুমতি দেয়। তবে ফেবল ৫ নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা এখনো চলছে।
গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতিকে ব্যবহার করে চীনের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে একাধিকবার বড় ধরনের আঘাত করেছে। কিন্তু অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপ সেই নীতির প্রচলিত যুক্তিকেই উল্টে দিয়েছে। কারণ এবার একই নীতিকে ব্যবহার করা হয়েছে একটি মার্কিন কোম্পানির বিরুদ্ধেই, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্রমেই আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এআই মডেলগুলোর ওপর সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
অত্যাধুনিক এআই নিয়ন্ত্রণের জটিলতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, খবর অনুযায়ী সরকার অ্যানথ্রপিকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই’কেও তাদের পরবর্তী মডেলের ব্যবহারকারীদের সংখ্যা সীমিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। আমরা সাধারণত এআইকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে আরও গভীর একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। তাহলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা বনাম উচ্চাভিলাষী বেসরকারি কোম্পানির ক্ষমতার মধ্যে।
দুই দেশই এখন নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে, তাদের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলো জাতীয় গর্বের প্রতীক, নাকি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি। উভয় দেশের এআই গবেষণাগারগুলোও ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে, তাদের কার্যক্রম কতটা রাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উচিত উচ্চাকাক্সক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেয়া। অন্যথায়, তারা এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, আর তাতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত নেতৃত্বও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের এআই নীতি এক চরম অবস্থান থেকে আরেক চরম অবস্থানে দুলেছে। ক্ষমতায় এসে তারা এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে কম গুরুত্ব দেয়, শ্রমিকদের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবকে ছোট করে দেখে এবং সরকারি হস্তক্ষেপ কম রাখার নীতির পক্ষে কথা বলে। কিন্তু মার্চ মাসে তাদের অবস্থান বদলে যায়। পেন্টাগন অ্যানথ্রপিককে সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি তাদের এআই মডেল স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র এবং দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক নজরদারিতে ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল।
পরের মাসে মিথোসের সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো প্রশাসনকে নিরাপত্তা বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে বাধ্য করেছে বলেই মনে হয়। ফেবল ৫’কে ঘিরে সংঘাত ছিল এমন এক টানাপড়েনের সর্বশেষ অধ্যায়, যেখানে একদিকে রয়েছে এমন একটি কোম্পানি, যারা নিরাপত্তা সুরক্ষার পক্ষে কথা বলে; অন্যদিকে রয়েছে এমন একটি প্রশাসন, যারা এসব মডেলের ওপর বাধাহীন নিয়ন্ত্রণ চায়। এদিকে চীনের সরকার অনেক দীর্ঘ সময় ধরেই তাদের এআই গবেষণাগারগুলোর ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে।
চীন এআই মডেল প্রকাশের আগে নিরাপত্তা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করেছে এবং এসব মডেল বেইজিংয়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয় শনাক্ত করতে পারে কি না, তাও পরীক্ষা করা হয়। নিজেদের চিপ শিল্পকে এগিয়ে নিতে চীন উন্নত এনভিডিয়া চিপ কেনার ওপর দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন চীনে এসব চিপ বিক্রির অনুমতি দেয়ার পরও এই নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার কয়েকজন এআই গবেষকের বিদেশ সফরেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এ ছাড়া ডিজিটাল সহকারী হিসেবে কাজ করা জনপ্রিয় এআই এজেন্ট ম্যানাস-এর দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতাকে বলা হয়েছিল, তাদের কোম্পানিকে মেটা অধিগ্রহণের বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা শেষ না করা পর্যন্ত তারা যেন চীন না ছাড়েন।
অল্প সময়ের মধ্যেই কর্তৃপক্ষ সেই অধিগ্রহণ চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে, চীনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও করপোরেট ক্ষমতার দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবে, তা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। তবে ২০২০ সালে বেইজিং যে কঠোর নিয়ন্ত্রক অভিযান শুরু করেছিল, তার প্রভাব এখনো স্পষ্ট।
জ্যাক মার বক্তব্যের পর থেকে আলিবাবা’র শেয়ারের মূল্য প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। অ্যান্ট গ্রুপ এখনো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। চীনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ প্রায় ভেঙে পড়েছিল; এখন ধীরে ধীরে তা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমানে চীনের প্রায় সব এআই গবেষণাগারের সঙ্গে আলোচনা করলেই সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ নিয়ে তীব্র অসন্তোষের কথা শোনা যায়।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে একই মাত্রার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ সেখানে শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে এবং এআই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে গভীর মূলধন বাজার। ফলে কোম্পানি ও সরকারি কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছাবেন বলেই ধারণা করা যায়। তবে সামনে এগোতে হলে ওয়াশিংটন এবং মার্কিন এআই গবেষণাগারগুলোর একে অপরের প্রতি আরও আন্তরিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন।
প্রথমত, এআই গবেষণাগারের প্রধানদের উচিত বারবার পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা। সরকারের সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবিলার কোনো বাস্তব পরিকল্পনা ছাড়াই এআইয়ের সম্ভাব্য ভয়াবহতা নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর কোনো অর্থ নেই। বর্তমান প্রশাসন কোম্পানিগুলোকে শাস্তি দিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বা রাজনৈতিক সমর্থকদের সন্তুষ্ট করতে আগ্রহী বলেই এমন সহযোগিতা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু এআই গবেষণাগারগুলোর উচিত এ প্রযুক্তির গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় আরও দায়িত্বশীল হওয়া।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, এআইয়ের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে পারস্পরিক বিশ্বাস ভেঙে পড়ার সুযোগ দেয়া যাবে না। সম্প্রতি অত্যন্ত উন্নত এআই মডেলের জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী পর্যালোচনা কর্মসূচি চালুর নির্বাহী আদেশ জারি করা হলেও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ’কে অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে সরকারের বিরোধ নিয়ে প্রকাশ্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
সরকার যথেষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়েই অ্যানথ্রপিকের ওপর বড় ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এআই প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মনোভাব সরকারের অপছন্দ হতে পারে, কিন্তু সে কারণে তাদের অবজ্ঞার সঙ্গে আচরণ করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এখন ভাবছে, তারা আদৌ মার্কিন এআই মডেলের ওপর নির্ভর করতে পারবে কি না। অন্যদিকে মার্কিন গবেষণাগারে কর্মরত মেধাবী বিদেশি গবেষকরাও নিজেদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। এই দুটি বিষয়ই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে নয়।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও দেশটির এআই গবেষণাগারগুলোর উচিত চীনের এআই উন্নয়ন সম্পর্কে নিজেদের ধারণা হালনাগাদ করা। এআই নিয়ে বেইজিংয়ের বক্তব্য অ্যানথ্রপিকের তুলনায় অনেক কম প্রলয়ঙ্কর। মার্কিন চিপের অভাবে চীনা কোম্পানিগুলো বড় ডাটা সেন্টারে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করতে পারছে। বরং তারা বাস্তব প্রযুক্তি ও শিল্পক্ষেত্রে এআই প্রয়োগের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সব দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, চীন এআইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করছে। চীনের অভ্যন্তরীণ এই টানাপোড়েন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সুযোগও তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে চীনা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকারী চীনা রাষ্ট্রের দূরত্ব আরও বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে সেটি করতে হলে বর্তমান প্রশাসনকে বিদেশি প্রতিভার প্রতি, বিশেষ করে চীনা নাগরিকদের প্রতি বিরূপ বলে মনে হয় এমন নীতিগুলো পরিত্যাগ করতে হবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর এআই-সংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই ক্ষতি করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই এআইয়ের ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে চায়, তাহলে বেইজিংয়ের ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি না করার ক্ষেত্রে আরও সফল হতে হবে।
