যেভাবে বিশ্বকাপে সবাইকে চমকে দিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে লড়াই নিশ্চিত করল কেপ ভার্দে

যেভাবে বিশ্বকাপে সবাইকে চমকে দিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে লড়াই নিশ্চিত করল কেপ ভার্দে

ফন্ট সাইজ:

কেপ ভার্দে ইতিহাস গড়েছে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নিজেদের নাম লিখিয়েছে তারা। আটলান্টিক মহাসাগরের ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ কেপ ভার্দের পুরস্কার হিসেবে শেষ ৩২-এ মুখোমুখি হতে হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার।

সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর মাঠেই একটি মোবাইল ফোন ঘিরে জড়ো হন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা। সেখানে তারা স্পেনের বিপক্ষে উরুগুয়ের ম্যাচের শেষ মুহূর্ত দেখেন। স্পেনের জয়ে নিশ্চিত হয়, গ্রুপ ‘এইচ’-এর রানার্সআপ হিসেবে নকআউট পর্বে উঠেছে কেপ ভার্দে।

হিউস্টনে বিবিসি রেডিও ৫ লাইভের ধারাভাষ্যকার রব ল বলেন, "গ্যালারিজুড়ে তখন ছিল গর্ব আর আনন্দের অশ্রু।"
তিনি বলেন, "একটা দারুণ দৃশ্য ছিল। খেলোয়াড়রা সবাই মোবাইল ফোন ঘিরে দাঁড়িয়ে শেষ বাঁশির অপেক্ষা করছিল।"
"শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠে এবং গ্যালারিতে আনন্দাশ্রু ঝরতে শুরু করে। কী অসাধারণ এক মুহূর্ত! এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের সেরা মুহূর্ত।" এর আগে উদ্বোধনী ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে চমকে দিয়েছিল কেপ ভার্দে। যেখানে ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা ছিলেন দলের নায়ক। এরপর দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের সঙ্গেও ২-২ গোলে ড্র করে তারা।

আইটিভিকে স্পেনের সাবেক বিশ্বকাপজয়ী হুয়ান মাতা বলেন, "তারা যা করছে, তা অবিশ্বাস্য। এটা শুধু স্পেনের বিপক্ষে একটি ম্যাচের বিষয় নয়; টানা তিনটি ম্যাচে তারা সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবল খেলেছে।"
মাত্র ৫ লাখ ২৫ হাজার জনসংখ্যার একটি দেশ। যারা বাছাইপর্বে পাঁচবারের আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলেছিল, তারা কীভাবে এত দূর এগিয়ে এল?

প্রবাসী-নির্ভর শক্তি ও ‘বড়দের টেবিলে’ পৌঁছানোর পরিকল্পনা
ব্লু শার্কসদের এই সাফল্যের প্রধান কারণ কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশনের (এফসিএফ) একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত—প্রবাসী কেপ ভার্দিয়ান খেলোয়াড়দের দলে অন্তর্ভুক্ত করা। সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক পর্তুগালের সঙ্গে কেপ ভার্দের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। গত শতাব্দীতে একের পর এক ভয়াবহ খরার কারণে অনেক মানুষ দ্বীপ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। পাশাপাশি সমুদ্রযাত্রার ঐতিহ্য ও নৌ-বাণিজ্যের কারণে নেদারল্যান্ডসের রটারডামেও কেপ ভার্দীয় বংশোদ্ভূত মানুষের একটি বড় সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে। বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের দলে থাকা ১৪ জন খেলোয়াড়ই দেশের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের জন্মই নেদারল্যান্ডসের বন্দরনগরী রটারডামে। এই ছয়জনের একজন ফরোয়ার্ড ডাইলন লিভ্রামেন্তো। গত মৌসুমে তিনি পর্তুগালের প্রিমেইরা লিগে কাসা পিয়ার হয়ে খেলেছেন। গত সেপ্টেম্বরে ক্যামেরুনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ জয়ে কেপ ভার্দের একমাত্র গোলটি করেছিলেন তিনিই।

কেপ ভার্দের পার্লামেন্ট সদস্য জোসিনা ফ্রেইতাস ফোর্তেস বিবিসি স্পোর্ট আফ্রিকাকে বলেন, "এফসিএফ আবেগ, অঙ্গীকার এবং একটি সুস্পষ্ট কারিগরি পরিকল্পনার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।"
তিনি বলেন, "আজ আমরা যে ফল দেখছি, তা বহু বছরের ধারাবাহিক পরিশ্রম, দৃঢ় বিশ্বাস এবং এই প্রকল্পে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়া মানুষের অবদানের ফল।" ২০১৯ সালে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম লিংকডইনের মাধ্যমে ডাবলিনে জন্ম নেওয়া সেন্টার-ব্যাক রবার্তো লোপেসকে দলে ভেড়ানোর গল্পটি এখন বেশ পরিচিত। এছাড়া সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড উইঙ্গার বেবে, যিনি পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলেছিলেন, ২০২৩ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন)-এ কেপ ভার্দের স্কোয়াডে ছিলেন।

রবার্তো লোপেস বলেন, "এই দলের ভেতরে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের আছে।" তিনি আরও বলেন, **"এটি হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো বিষয় নয়। আমি দলে যোগ দেওয়ার আগেও, আর এরপরও, কেপ ভার্দেকে বিশ্বের বড় বড় ফুটবল জাতির কাতারে নিয়ে যাওয়ার জন্য ধারাবাহিক একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।"

কোচিংয়ে স্থিতিশীলতা—‘শক্তি, ঐক্য ও দৃঢ়তার’ ভিত্তি
কেপ ভার্দের পারফরম্যান্সে বড় কৃতিত্ব যায় কোচ বুবিস্তার দিকে, যিনি নিজেও একজন সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার এবং ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে দলের দায়িত্বে আছেন। দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল কোচিং কাঠামো ৫৬ বছর বয়সী সাবেক সেন্টার-ব্যাক বুবিস্তাকে সুযোগ দিয়েছে একটি সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ দল গড়ে তোলার। তার অধীনে কেপ ভার্দে গড়ে তুলেছে একটি কমপ্যাক্ট দল—যেখানে রয়েছে সংগঠিত রক্ষণভাগ, টেকনিক্যাল মিডফিল্ডার এবং প্রতিভাবান আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা। এই দল আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ২০২৩-এ ঘানাকে হারায় এবং মিশরের সঙ্গে ড্র করে কোয়ার্টার-ফাইনালে পৌঁছায়—যেখানে তারা মাত্র ১০ বছর আগে প্রথমবার টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল।

স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র ম্যাচে অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা সাতটি সেভ করে দলকে রক্ষা করলেও তাদের শৃঙ্খলার দিকটি আরও বেশি চোখে পড়ে। স্পেনের মতো ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে তারা ম্যাচে মাত্র একটি ফাউল করে—যা ১৯৬৬ সালের পর কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে সবচেয়ে কম ফাউলের রেকর্ডগুলোর একটি। কোচ বুবিস্তাকে নিয়ে ডিফেন্ডার সিডনি লোপেস কাবরাল বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে বলেন, "আমরা সবসময় একসাথে একটি ইউনিট হিসেবে অনুশীলন ও খেলা করি, তাই ম্যাচে যা করেছি তা নতুন কিছু নয়।" তিনি আরও বলেন, "এটাই আমাদের খেলা। এভাবেই আমরা খেলি, এটাই আমরা। এটি আমাদের ব্যক্তিত্ব—দল হিসেবে এবং ডিফেন্ডার হিসেবে।"

উরুগুয়ের বিপক্ষে গ্রুপ এইচ-এর দ্বিতীয় ম্যাচে কেপ ভার্দে আরও আক্রমণাত্মক ও বিস্তৃত কৌশল নিয়ে মাঠে নামে, তবে একই সঙ্গে তারা তাদের দৃঢ় মানসিকতার প্রমাণও দেয়—দ্বিতীয়ার্ধে গুরুত্বপূর্ণ এক সমতাসূচক গোল করে।
কোচ বুবিস্তা বলেন, "ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি দল হিসেবে আমাদের পরিচয় দেখাতে পারা—আমাদের শক্তি, আমাদের ঐক্য এবং আমাদের দৃঢ়তা।"

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সাফল্যের জন্য বুবিস্তা ২০২৫ সালে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (সিএএফ) কর্তৃক মহাদেশের বর্ষসেরা কোচ হিসেবে স্বীকৃতি পান। তিনি সবসময় বিশ্বাস করে এসেছেন যে তার দল বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা রাখে। ২০২১ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের আগে, যখন ব্লু শার্কস শেষ ষোলোতে পৌঁছেছিল, তখন বিবিসি স্পোর্ট আফ্রিকাকে তিনি বলেছিলেন, "আমরা আমাদের দেশের আকার বিবেচনায় সত্যিই ভালো করছি। আমি মনে করি ভবিষ্যতে আমরা বিশ্বকাপে থাকব।" তার সেই সাহসী ভবিষ্যদ্বাণী এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এখন বুবিস্তা আশা করছেন, সম্প্রসারিত এই টুর্নামেন্টে কেপ ভার্দের অর্জন বিশ্বজুড়ে অন্যান্য আন্ডারডগ দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করবে। তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি ফুটবল সবার জন্য—বা ফুটবল সবারই হওয়া উচিত।"
পুরস্কার? নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা
কেপ ভার্দের পুরস্কার হবে নকআউট পর্বে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়া, যা শুক্রবার মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হবে। সৌদি আরবের বিপক্ষে ড্রয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে নিজের দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে বুবিস্তা বলেন, “আমাদের কাছে কিছুই অসম্ভব নয়।” তিনি বলেন, “শুরু থেকেই আমরা বলেছি, আমাদের লক্ষ্য ছিল আমাদের দেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।” “এই পর্যায়ে আর্জেন্টিনা ও মেসির বিপক্ষে খেলা আমাদের দেশের জন্য অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা—ম্যাচের ফল যাই হোক না কেন।” মিডফিল্ডার ডেরয় দুয়ার্তে, যিনি সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচে ম্যাচসেরা হন, বলেন: “সত্যি বলতে, এটা পাগলামি। মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি।” তিনি আরও বলেন, “প্রথমে উদযাপন করি। আমরা খুব খুশি। আশা করি সব কেপ ভার্দিয়ানরাও খুশি। কাল থেকে আমরা পরের ম্যাচ নিয়ে ভাবব।” “আর্জেন্টিনার বিপক্ষে, তাই না? কঠিন ম্যাচ, কিন্তু আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। কিছুই অসম্ভব নয়।”

সাবেক টটেনহ্যাম, নটিংহ্যাম ফরেস্ট, সেল্টিক ও অস্ট্রেলিয়া কোচ অ্যাঞ্জে পোস্টেকোগ্লু আইটিভিকে বলেন, “এটাই বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য—এটি একটি দারুণ গল্প।” তিনি বলেন, “ফুটবল পৃথিবীর প্রতিটি কোণকে ছুঁয়ে যায়, কেপ ভার্দের গল্প সেটাই প্রমাণ করছে।” সাবেক ইংল্যান্ড ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল বলেন, “যারা মনে করেছিল বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ ঠিক হয়নি, তারা হয়তো এখন কেপ ভার্দের পারফরম্যান্স দেখে মত বদলাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার একটি দেশ নকআউটে উঠেছে—আর উরুগুয়ের মতো বড় দল বাদ পড়েছে। সত্যিই অসাধারণ মুহূর্ত।”

সূত্র: বিবিসি

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন