বাংলাদেশের বীমা খাতকে একটি কার্যকর, টেকসই ও জনআস্থাভিত্তিক খাতে পরিণত করতে হলে দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার কোনও বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির অভাব, প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে খাতটিকে আধুনিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে।
শনিবার রাজধানীর বিজয়নগরের একটি হোটেলে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট-পরবর্তী বীমা খাত: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বীমা খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় ডিজিটালাইজেশন হয়নি। ফলে গ্রাহকসেবা, দাবি নিষ্পত্তি, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শুধু গ্রাহক সন্তুষ্টিই বাড়বে না, একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
তাই দুর্যোগজনিত ক্ষতি মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী বীমা খাত গড়ে তোলা সময়ের দাবি। কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ঘাটতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, শুধু প্রচলিত তদারকির ওপর নির্ভর করলে হবে না। খাতভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়িয়ে আরও কার্যকর ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বীমা খাতের টেকসই সংস্কারের জন্য তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে—গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ শক্তিশালী করা এবং মানবসম্পদের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সাঈদ আহমেদ (এমপি) বলেন, বীমা কমিশনকে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও অনিয়মের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে মোটরযান বীমাকে আরও কার্যকরভাবে বাধ্যতামূলক করা এবং নতুন নতুন খাতে বীমা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী বলেন, বীমা খাতের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডও জনসাধারণের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নুরুজ্জামান বলেন, নন-লাইফের তুলনায় লাইফ বীমা খাতে সংকট বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি এবং তারল্য সংকট নিরসনে ব্যাংক ঋণ সহায়তা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সহজ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বীমা খাতের গুরুত্ব অনেক হলেও এটি এখনও অবহেলিত। বিমার প্রবেশযোগ্যতা খুবই কম, যা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কৃষি ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিমার পরিধি বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, আর্থিক খাতে নৈতিক ঝুঁকি, দুর্বল সুশাসন ও জবাবদিহির সংকট দূর করা না গেলে বীমা খাতেরও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইআরএফের সভাপতি গোলাম মওলা। বিশেষ অতিথি ছিলেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ (এমপি), বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক যুগান্তরের বিজনেস এডিটর মনির হোসেন। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, অর্থনীতির আকারে বিশ্বের ৩৫তম হলেও বীমা শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান ৬০তম, যা খাতটির অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারারই প্রতিফলন। মূল প্রবন্ধে তিনি জাতীয় বীমা নীতির বাস্তবায়ন, আইডিআরের সক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধি, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু, কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, গ্রাহকের অনিষ্পন্ন দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সেবার মানের ভিত্তিতে বীমা কোম্পানির ক্যাটাগরি নির্ধারণের সুপারিশ করেন। তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের সমালোচনাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গণমাধ্যম, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বীমা কোম্পানিগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বীমা খাতের উন্নয়নে গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে সেমিনারের বক্তারা একমত হন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এশিয়া ইন্স্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমাম শাহীন, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুর রহমান, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাইদুল আমিন, পদ্মা ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিদুজ্জামান, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ মুজতবা সিদ্দিকী, ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিম, এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ জামাল হাওলাদার, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম শহিদুল্লাহসহ বীমা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষক ও সাংবাদিকরা।
