বিশ্বকাপের পুনর্বিক্রয় টিকিট বাতিল হওয়ায় ম্যাচ মিস করছেন সমর্থকরা

অনলাইন এনপিআরের রিপোর্ট

বিশ্বকাপের পুনর্বিক্রয় টিকিট বাতিল হওয়ায় ম্যাচ মিস করছেন সমর্থকরা

ফন্ট সাইজ:

গত সপ্তাহে স্কটল্যান্ড বনাম মরক্কো ম্যাচ চলাকালে ৬৫ বছর বয়সী জন ম্যাকনিকোলাস ম্যাসাচুসেটসের ফক্সবরোর গিলেট স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার এক কান ছিল স্টেডিয়ামের ভেতর থেকে ভেসে আসা সমর্থকদের উল্লাসধ্বনির দিকে। আর অন্য কানে ছিল টিকিট বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম স্টাবহাবের গ্রাহকসেবা প্রতিনিধির সঙ্গে ফোনালাপ। দুটি আসনের জন্য ১২০০ ডলারের বেশি খরচ করা, নিউ জার্সি থেকে বোস্টন পর্যন্ত চার ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যাওয়া এবং হোটেল থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত প্রায় দুই মাইল হাঁটার পর ম্যাকনিকোলাস জানতে পারেন যে তার বিশ্বকাপের টিকিট আর পাওয়া যাচ্ছে না। সবচেয়ে কঠিন ছিল তার বন্ধু ডেভিড ওয়েইনকে খবরটি জানানো। ওয়েইন বৃটেন থেকে এসেছিলেন ম্যাকনিকোলাসের সঙ্গী হিসেবে ম্যাচটি দেখতে। দু’জনই বিরতির আগ পর্যন্ত আশা ছাড়েননি।

ম্যাকনিকোলাস বলেন, আমরা অপেক্ষা করছিলাম। কারণ ভেবেছিলাম হয়তো শেষ মুহূর্তে কেউ সমস্যার সমাধান করতে পারবে। কিন্তু কিছুই ঘটেনি। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর থেকে পুনর্বিক্রয় বাজার থেকে টিকিট কেনা ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সমর্থক অভিযোগ করছেন যে ম্যাচের দিন তারা টিকিট পাননি। ফলে তাদের হয় জীবনের বিরল এক সুযোগ হাতছাড়া করতে হয়েছে, নয়তো তড়িঘড়ি করে নতুন টিকিট কিনতে হয়েছে, যা অনেক সময় আগের দামের দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি এবং আসনও তুলনামূলক খারাপ ছিল। অভিযোগের বড় অংশই গেছে টিকিট পুনর্বিক্রয়ের অন্যতম বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম স্টাবহাবের বিরুদ্ধে। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু সমর্থক ভিভিড সিটস এবং সিটগিক নিয়েও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। বিশ্বকাপের টিকিট নিয়ে উচ্চমূল্য ও আসন বিন্যাস নিয়ে বিভ্রান্তির পর এটি নতুন আরেকটি বিতর্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে।

স্টাবহাব এনপিআরকে ই-মেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সমস্যার মূল কারণ ফিফার টিকিটিং অবকাঠামো, যার মধ্যে তাদের অ্যাপও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই অ্যাপে উল্লেখযোগ্য কর্মক্ষমতা সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, যা সব ধরনের পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে টিকিট স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে।

অন্যদিকে, ফিফা এনপিআরকে জানিয়েছে, কেবল তাদের সরকারি প্ল্যাটফর্ম থেকে কেনা টিকিটের বৈধতা ও সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি, যা নিজস্ব পুনর্বিক্রয় মার্কেটপ্লেসও পরিচালনা করে, স্টাবহাবের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে যে টিকিট সমস্যার জন্য ফিফা দায়ী। ফিফা বলেছে, তৃতীয় পক্ষের প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হওয়া দ্বিতীয় পর্যায়ের টিকিট লেনদেন সম্পর্কে ফিফার কোনো তথ্য বা নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হওয়া লেনদেন ফিফার সরকারি টিকিটিং প্ল্যাটফর্মের বাইরে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়।

টেক্সাসের সান আন্তোনিওর বাসিন্দা ব্র্যাড মিশেল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্টাবহাব থেকে প্রায় ১৫ হাজার ৬০০ ডলার ব্যয়ে সেন্টার লাইনের কাছাকাছি তিনটি আসন কিনেছিলেন। এটি ছিল ফিফার টিকিট বিক্রি শুরুর কয়েক মাস আগে। তিনি মনে করেছিলেন, ফিফার লটারিভিত্তিক ব্যবস্থার ঝামেলা এড়িয়ে এভাবে টিকিট সংগ্রহ করা সহজ হবে। তিনি বলেছেন, আমি ভেবেছিলাম অনেক আগে টিকিট কিনে রাখলে ফিফার ওয়েবসাইট চালু হওয়ার পর যে সব নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেগুলো এড়াতে পারব। টিকিটগুলো ছিল হিউস্টনে অনুষ্ঠিত নেদারল্যান্ডস বনাম সুইডেন ম্যাচের জন্য। তিনি ম্যাচটি দেখতে চেয়েছিলেন তার ১২ বছর বয়সী ছেলে এবং সুইডেনে বসবাসকারী শ্বশুরের সঙ্গে। মিশেল জানিয়েছেন, তিনি স্টাবহাবের ‘ফ্যানপ্রটেক্ট গ্যারান্টি’ নীতির ওপর আস্থা রেখেছিলেন। এই নীতিতে বলা হয়েছে, মূল টিকিট না পৌঁছালে ক্রেতাকে অর্থ ফেরত দেয়া হবে অথবা সমমানের বিকল্প আসন দেয়া হবে। কিন্তু তার দুটি টিকিট কখনোই পৌঁছায়নি। পরে স্টাবহাবের প্রতিনিধি বিকল্প আসনের প্রস্তাব দেন। তবে সেগুলো কী ধরনের আসন তা শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। তিনি বলেছেন, আমার মাঠের খুব কাছে প্রিমিয়াম মিডফিল্ড আসনের বদলে তারা এমন টিকিট দিতে চেয়েছিল, যেগুলো ছিল একেবারে ওপরের সারিতে বা গোলপোস্টের পেছনে। তাও কোনো অতিরিক্ত অর্থ ফেরত ছাড়াই। আমি বলেছি, কোনোভাবেই না। আমি এগুলো নেব না।

পরে মিশেল জানতে পারেন, কোন টিকিটকে ‘সমমানের’ ধরা হবে, তা সম্পূর্ণভাবে স্টাবহাবের বিবেচনার বিষয়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বিকল্প টিকিট নির্ধারণে মূল্য, মান, প্রাপ্যতা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত মিশেল ও তার পরিবার ভাড়া নেয়া এয়ারবিএনবিতে বসে টেলিভিশনে ম্যাচটি দেখেন। তবে তার মনোযোগ ছিল স্টেডিয়ামের দর্শকসারির দিকে। তিনি টেলিভিশনের পর্দায় নিজের মূল আসনগুলো খুঁজছিলেন, যা তার কাছে দখল করা অবস্থায় মনে হয়েছিল। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্তও তিনি অর্থ ফেরতের আশায় ছিলেন।

কানাডার আলবার্টা থেকে ব্রেট রোমাস তার ১৩ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে হিউস্টনে এসেছিলেন পর্তুগাল বনাম উজবেকিস্তান ম্যাচ দেখতে। তার ছেলে পর্তুগালের তারকা ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বড় ভক্ত। কিন্তু টিকিট ই-মেইলে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, স্টাবহাব ভুলবশত বোস্টনে অনুষ্ঠিত ইংল্যান্ড বনাম ঘানা ম্যাচের টিকিট পাঠিয়েছে। সমস্যার সমাধান করতে রোমাস পুরো রাত জেগে কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ম্যাচের দিন সকালে এক প্রতিনিধি ই-মেইলে লিখেছেন, আমাদের সিস্টেমে একটি ত্রুটি হয়েছে এবং আমরা কেবল অর্থ ফেরতের প্রস্তাব দিতে পারি।

রোমাস বলেন, শুধু ম্যাচ মিস করার সম্ভাবনাই নয়, ছেলেকে হতাশ করার বিষয়টিও তাকে কষ্ট দিয়েছে। তিনি বলেছেন, আমরা অন্য দেশে উড়ে এসেছি এই ম্যাচ দেখার জন্য। আমার ছেলে এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিল। কিন্তু সে রাতে ঘুমাতে গেছে এই ভেবে যে হয়তো ম্যাচে যেতে পারবে না। একজন বাবা হিসেবে এটা আমার জন্য হৃদয়বিদারক ছিল। অবশেষে রোমাস ফিফার মাধ্যমে আরেক জোড়া টিকিট কিনতে সক্ষম হন। কিন্তু ততক্ষণে পাশাপাশি দুটি আসনের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাকে ও তার ছেলেকে আলাদা আলাদা আসনে বসে ম্যাচ দেখতে হয়েছে।

রোমাস বলেছেন, আমরা পাশাপাশি বসার জন্য ১১৫ নম্বর সেকশনের টিকিট থেকে গিয়ে ৬৩৫ নম্বর সেকশনের এমন দুটি আসন পেয়েছি, যেগুলো এক সারি ও পাঁচটি আসন দূরে ছিল।

স্টাবহাব জানিয়েছে, তাদের অধিকাংশ টিকিট স্থানান্তর সফল হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন প্রযুক্তিগত সমস্যা ঠেকাতে তারা ফিফার সঙ্গে কাজ করছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ন্যাশনাল কনজিউমারস লিগের সহসভাপতি জন ব্রেয়ল্ট বলেছেন, টিকিট না পাওয়ার ঘটনা শুধু বিশ্বকাপে সীমাবদ্ধ নয়; অতীতেও বিভিন্ন সরাসরি আয়োজনে এমন ঘটনা ঘটেছে। তার মতে, অনেক সময় টিকিট পুনর্বিক্রেতারা নিজেদের কাছে টিকিট আসার আগেই সেগুলো বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করেন। এ ধরনের চর্চাকে বলা হয় ‘স্পেকুলেটিভ টিকিটিং’।
স্টাবহাব, সিটগিক ও ভিভিড সিটসের নিয়ম অনুযায়ী, অনুমাননির্ভর বা স্পেকুলেটিভ টিকিট বিক্রি নিষিদ্ধ। প্রতিষ্ঠানগুলো আরও জানিয়েছে, টিকিট সরবরাহে ব্যর্থ বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে তারা জরিমানা থেকে শুরু করে অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার মতো ব্যবস্থা নেয়। তবে ব্রেয়ল্টের মতে, কোম্পানিগুলোর বর্তমান নীতিমালা ভোক্তাদের যথেষ্ট সুরক্ষা দেয় না। এমন চর্চা ঠেকাতে আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। তার মতে, অর্থ ফেরত দেয়া হলেও বিশ্বকাপের মতো জীবনে একবার পাওয়া সুযোগ হারানোর ক্ষতিপূরণ তা হতে পারে না, বিশেষ করে যখন সমর্থকেরা ভ্রমণ ও থাকার জন্যও বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপের মতো জীবনে একবার পাওয়া কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু অর্থ ফেরত দেয়া অধিকাংশ সমর্থকের জন্য যথেষ্ট নয়। তারা স্টেডিয়ামে ঢুকে সেই ম্যাচ দেখতে চান, যেটি দেখার স্বপ্ন নিয়ে তারা এত কিছু করেছেন।

নিউ জার্সির ম্যাকনিকোলাস জানেন না, ভবিষ্যতে আর কখনো বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার সুযোগ তার হবে কি না। পুরো অভিজ্ঞতা তাকে ফিফা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের টিকিট পুনর্বিক্রয় বাজার সম্পর্কে তিক্ত অনুভূতি দিয়েছে। তিনি বলেছেন, আমরা এখানে পৌঁছাতে এত সময়, অর্থ ও পরিশ্রম ব্যয় করেছি। আর শেষ পর্যন্ত আমাদের পায়ের নিচ থেকে যেন হঠাৎ করে মাটি সরিয়ে নেয়া হলো। এটি সত্যিই বড় ধরনের হতাশা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন