দেশের সরকারি সেবাখাতে দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে পাসপোর্ট অফিস। এর পরই রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীর ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর ফলাফল প্রকাশ করে টিআইবি।
জরিপে উঠে এসেছে, সেবা নিতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক নাগরিককে ঘুষ, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, অযৌক্তিক বিলম্ব এবং নানা ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে পাসপোর্ট সেবায় আবেদন, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং ডেলিভারির বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে বিআরটিএতেও ব্যাপক ভোগান্তি ও অনিয়মের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা। টিআইবি’র পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে দালালচক্র ও দুর্নীতির প্রভাব এখনো পুরোপুরি কমেনি। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে সেবা না পাওয়া, অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতাকে দুর্নীতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে আরও দেখা গেছে, ভূমি সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতেও দুর্নীতির অভিযোগ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনসেবায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, নাগরিকদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।
আগের তুলনায় দুর্নীতি বেড়েছে: আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেবাখাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরও বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে টিআইবি জরিপে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশ ইউএনডিপি’র গ্লোবাল ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সূচকে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে, সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো। কিন্তু সেই ডিজিটাল সেবার সুযোগ আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। সেবাখাতে ঘুষের ‘প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেনÑ যারা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকে বলেছেন, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। ঘুষকে একটি বাস্তবতায় পরিণত করা হয়েছে। দুর্নীতির কারণে তৈরি হওয়া বৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের ভোগান্তি নিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এর ফলে আপনারা দেখেছেন, সেবা খাতের দুর্নীতি বৈষম্যমূলক। যারা ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন, তারা লাভবান হন; আর যাদের হাতে ক্ষমতা নেই, তারা বঞ্চিত হন। গ্রামাঞ্চলের মানুষের ওপর দুর্নীতির বোঝা শহরাঞ্চলের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। আবার বেশ কিছু সেবা খাতে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। আদিবাসী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ছে। টিআইবি বলছে, ২০২৩-এর তুলনায় ২০২৫ সালে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে; খানা জরিপ ২০২৫-এ গড় ঘুষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি যথাক্রমে বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যাংকিং ও ভূমি খাতে। খানা জরিপ ২০২৫-এ জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২ কোটি টাকা, যা ২০২৩-এর তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি এবং ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটের (সংশোধিত) ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। টিআইবি জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় দুর্নীতি ও ঘুষের উচ্চ হার অব্যাহত রয়েছে, যা সাধারণ জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা। অন্যদিকে কৃষি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট এবং বিআরটিএ’র মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে উচ্চ দুর্নীতি ও ঘুষ বৃদ্ধি পেয়েছে বা একইরকম রয়েছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক সেবাপ্রাপ্তির অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে।
টিআইবি’র জরিপে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী ৬৬ শতাংশ খানা ঘুষের শিকার হয়েছে। শহরাঞ্চলে শিকার হয়েছেন ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলের খানাগুলোকে বেশি পরিমাণে ঘুষ দিতে হয়েছে বলেও জরিপে উঠে এসেছে।
দুদকের ওপর এখনো আস্থা তৈরি হয়নি
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অকার্যকারিতা ও জনগণের আস্থার সংকট নিয়ে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমাদের জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা বলছে, শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকায় দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ দুদক সম্পর্কে জানেন বা পরিচিত। কিন্তু যারা দুদকে অভিযোগ করেছেন, তাদের হার মাত্র ০ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ দুদকের ওপর মানুষের আস্থা এখনো তৈরি হয়নি।
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে টিআইবি’র ১০ দফা সুপারিশ
সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রতিটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সেবাদাতাদের জন্য যুগোপযোগী আচরণবিধি প্রণয়ন করতে হবে। সেখানে কীভাবে এবং কতো সময়ের মধ্যে সেবা প্রদান করতে হবে, সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে- এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। পাশাপাশি সেবা গ্রহণের পর নাগরিকদের মতামত নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বার্ষিক মূল্যায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
সেবা খাতে হয়রানি কমাতে অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার তাগিদ দিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গ্রিভেন্স রিড্রেস সিস্টেম (জিআরএস) অধিকতর ব্যবহারবান্ধব করার পাশাপাশি এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। অভিযোগ জানাতে নাগরিকদের জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
টিআইবি’র সুপারিশ অনুযায়ী, সব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বাক্স স্থাপন, এসএমএস, ই-মেইল ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একইসঙ্গে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু ও কার্যকর করার পাশাপাশি এ বিষয়ে জনগণকে অবহিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও কার্যকর করতে প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার এবং দুদকের হটলাইন ১০৬-এর ব্যাপক প্রচারণারও সুপারিশ করা হয়েছে।
