স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, জনবল সংকট ও সেবার বাস্তবতা: বক্তব্যের আড়ালে যে কঠিন সত্য

স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, জনবল সংকট ও সেবার বাস্তবতা: বক্তব্যের আড়ালে যে কঠিন সত্য

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত বহু বছর ধরেই এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে চলছে। একদিকে দেশের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে; অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষ এখনো চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে দিশেহারা। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অপ্রতুলতা, শূন্য পদ, ওষুধের উচ্চমূল্য এবং বিদেশমুখী রোগীর সংখ্যা—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জগুলো দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধির বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতের এই সংকটগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা শুধুমাত্র বাজেটের অপ্রতুলতা নয়; বরং এটি পরিকল্পনা, জনবল, অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের একটি সমন্বিত সংকট।
স্বাস্থ্যসেবার রাজধানীকেন্দ্রিকতা: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈষম্য
সমাজকল্যাণ, শিশু-মহিলা বিষয়ক মাননীয় ও বিএমএর-ড্যাবের সাবেক মহাসচিব মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫ হাজারে উন্নীত করলেই দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন হবে না। বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঢাকা মেডিকেলের মানের একাধিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং প্রতিটি বিভাগে জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা বলতে অধিকাংশ মানুষ এখনো ঢাকাকেই বোঝেন। দেশের প্রায় সব বিভাগ ও জেলার রোগীরা জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে ছুটে আসেন।
ফলাফল হলো-
* ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট, ক্যানসার হাসপাতালসহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ।
* চিকিৎসকদের ওপর অস্বাভাবিক কর্মভার।
* বেডের তুলনায় বহু গুণ বেশি রোগী ভর্তি।
* জরুরি বিভাগে দীর্ঘ অপেক্ষা।
* রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি।
অন্যদিকে অনেক জেলা সদর হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আধুনিক অবকাঠামো থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে সেগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি বিভাগে যদি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট, জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেসের আদলে বিশেষায়িত কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তাহলে ঢাকার ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে যাবে।
স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি: প্রয়োজনীয় কিন্তু যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির তুলনায় কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত। তবে শুধু বাজেট বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।
কারণ-
* অনেক হাসপাতালে বরাদ্দকৃত অর্থ সময়মতো ব্যবহার হয় না।
* যন্ত্রপাতি কেনা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে।
* নতুন ভবন নির্মিত হলেও জনবল নিয়োগ হয় না।
* ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকে।
অর্থাৎ অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা।
৮০ হাজার শূন্য পদ: স্বাস্থ্য খাতের নীরব মহামারী
ডা. মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের বক্তব্য অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৮০ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় সংকট।
এই শূন্য পদের মধ্যে রয়েছে-
* চিকিৎসক
* নার্স
* মেডিকেল টেকনোলজিস্ট
* ফার্মাসিস্ট
* স্বাস্থ্য পরিদর্শক
* ওয়ার্ড বয়
* পরিচ্ছন্নতা কর্মী
* বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার
বাংলাদেশে বহু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ থাকলেও বাস্তবে সেখানে কেউ কর্মরত নেই।
ফলে-
* রোগীকে জেলা বা ঢাকায় রেফার করা হয়।
* চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হয়।
* অনেক রোগী পথে মারা যান।
* চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিদেশমুখী রোগী: বছরে হাজার কোটি টাকার অর্থপাচার
ডা. মাহমুদা আলম মিতু উল্লেখ করেছেন যে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং তুরস্ক বর্তমানে বাংলাদেশি রোগীদের প্রধান গন্তব্য। প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য বিদেশে কয়েক বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।

রোগীরা কেন বিদেশে যান?
কারণগুলো হলো
১. আস্থার সংকট
অনেক রোগী মনে করেন বিদেশে চিকিৎসার মান ভালো।
২. সমন্বিত সেবা
এক জায়গায় চিকিৎসক, পরীক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়া যায়।
৩. দ্রুত সেবা
অপেক্ষার সময় তুলনামূলক কম।
৪. আধুনিক প্রযুক্তি
কিছু উন্নত প্রযুক্তি এখনো দেশে পর্যাপ্তভাবে বিস্তৃত নয়।
৫. রোগী ব্যবস্থাপনা
রোগীর সাথে আচরণ ও কাউন্সেলিংয়ের মান উন্নত।
তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বাংলাদেশে হৃদরোগ, কিডনি, নিউরোসার্জারি, ক্যানসার চিকিৎসা, লিভার সার্জারি এবং ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজির মতো অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা হচ্ছে।
তবুও রোগী বিদেশে যাচ্ছেন মূলত সিস্টেমের দুর্বলতা ও আস্থার সংকটের কারণে।
ওষুধের দাম: চিকিৎসা ব্যয়ের সবচেয়ে বড় বোঝা
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতের বক্তব্যে ওষুধের সহজলভ্যতা ও প্রয়োজনভিত্তিক সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়।

এই ব্যয়ের মধ্যে প্রধান অংশ হলো-
* ওষুধ
* ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা
* হাসপাতালে যাতায়াত
* হাসপাতালে থাকা-খাওয়ার ব্যয়
অনেক রোগী নিয়মিত ওষুধ কিনতে না পেরে চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করে দেন।
বিশেষ করে
* হৃদরোগ
* ডায়াবেটিস
* উচ্চ রক্তচাপ
* কিডনি রোগ

এসব দীর্ঘমেয়াদি রোগে ওষুধের খরচ পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা: অবহেলিত কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত
বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবতা হলো-
* কমিউনিটি ক্লিনিক
* ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র
* উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এখনো কাঙ্ক্ষিত নয়।
ফলে সাধারণ রোগও বড় আকার ধারণ করে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি হিসেবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশেও একই কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
স্বাস্থ্য বীমা: ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন
বাংলাদেশে এখনো সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু হয়নি। ফলে একজন ব্যক্তি অসুস্থ হলে তার পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে-
* জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা
* দরিদ্রবান্ধব স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি
* বয়স্কদের স্বাস্থ্য কভারেজ
* দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ সহায়তা
চালু করা গেলে স্বাস্থ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা: সময়ের দাবি
ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবা কল্পনা করা যায় না।
বাংলাদেশে প্রয়োজন-
* জাতীয় ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড
* টেলিমেডিসিন
* টেলি-ইসিজি নেটওয়ার্ক
* ডিজিটাল রেফারেল সিস্টেম
* এআই-ভিত্তিক রোগ নির্ণয় সহায়তা
এগুলো চালু হলে উপজেলা পর্যায়ের রোগীও দ্রুত বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পেতে পারবেন।
করণীয়: স্বাস্থ্য খাতের জন্য ১০ দফা সংস্কার কর্মসূচি
১. স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫% বরাদ্দ।
২. দ্রুত ৮০ হাজার শূন্য পদ পূরণ।
৩. প্রতিটি বিভাগে সুপার-স্পেশালাইজড হাসপাতাল।
৪. উপজেলা হাসপাতালকে ১০০-২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ।
৫. জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা চালু।
৬. ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক খরচ নিয়ন্ত্রণ।
৭. হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি।
৮. আধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।
৯. চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্ট প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি।
১০. রোগীকেন্দ্রিক ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো কেবল সমস্যা চিহ্নিত করেনি, বরং ভবিষ্যৎ সংস্কারের দিকনির্দেশনাও দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন শুধু হাসপাতালের বেড সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি, সুশাসন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়।

যদি স্বাস্থ্যসেবাকে সত্যিকার অর্থে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হয়, তবে ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বের হয়ে বিকেন্দ্রীকরণ, জনবল উন্নয়ন এবং রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যসেবাকে ব্যয় নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এখনই।

লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন