জমকালো আলোর নিচে চলছিল জন্মদিনের কেক কাটার আনন্দ। উৎসবের সেই হাসির আমেজ মুহূর্তেই রূপ নিলো আতঙ্কে। খোদ পুলিশের একটি দল আকস্মিকভাবে হানা দিলো উৎসবস্থলে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নাশকতা, হামলা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অবশেষে গ্রেপ্তার হলেন বগুড়ার স্বাস্থ্য খাতের এক সময়ের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) জেলা শাখার সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা ডা. সামির হোসেন মিশু।
মঙ্গলবার (২৩শে জুন ২০২৬) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ধুনট মোড় এলাকার ‘হোটেল মকটেল’ নামক একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। ফ্যাসিবাদের পতনের পর দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা এই প্রভাবশালী চিকিৎসকের গ্রেপ্তারের খবরে জেলা জুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডা. সামির হোসেন মিশু মঙ্গলবার রাতে শেরপুরের ধুনট মোড়ের ওই রেস্টুরেন্টে পরিচিত এক চিকিৎসকের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি যখন কেক কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শেরপুর থানা পুলিশ সেখানে এক ঝটিকা অভিযান চালায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে অনুষ্ঠানস্থল থেকেই তাকে হাতকড়া পরানো হয়।
বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইব্রাহিম বলেন, “বগুড়া সদর থানার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও নাশকতা সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট মামলায় তাকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।”
আটক ডা. সামির হোসেন মিশু বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকার মৃত ডা. সাফদার হোসেনের ছেলে। তিনি বগুড়ার একজন সুপরিচিত চিকিৎসক হলেও তার মূল পরিচিতি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে। স্বাচিপের জেলা সভাপতি পদের পাশাপাশি তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের বগুড়া শাখার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলের বেশির ভাগ সময় তিনি বগুড়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে একচ্ছত্র রাজত্ব করেছেন। তৎকালীন সময়ে বগুড়ার একটা শ্রেণির মানুষের কাছে তিনি ‘গরিবের ডাক্তার’ বলে লোক দেখানো খ্যাতি অর্জন করলেও, তার আড়ালের অন্ধকার জগৎটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আতঙ্কের।
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর তাকে বগুড়া থেকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় বাগেরহাটে। বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে (আইএইচটি) কর্মরত রয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতার মোহে অন্ধ ডা. মিশু দীর্ঘদিন তার নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে কর্মে অনুপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে এবং বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মীদের দমনে পর্দার আড়াল থেকে নানামুখী ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
ডা. মিশু গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে তার অতীত অপকর্মের খতিয়ান উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। বর্তমানে ঢাকায় একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কর্মরত বগুড়ার সাংবাদিক আকতারুজ্জামান তার ফেসবুক টাইমলাইনে ডা. মিশুর হিংস্র রূপের এক ভয়ঙ্কর স্মৃতি রোমন্থন করেছেন।
সাংবাদিক আকতারুজ্জামান জানান, ২০২১ সালের ১৭ই জুলাই রাত ২টা ৪৫ মিনিটে ডিবি পুলিশ তার বাসভবনের দরজা ভাঙার শব্দে তিনি জেগে ওঠেন। ঘরের ভেতর ডিবি’র সঙ্গে স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এই ডা. মিশু ও তার ক্যাডার বাহিনী। আকতারুজ্জামান যখন নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেন, তখন ডা. মিশু পেছন থেকে অত্যন্ত অশালীন ও নোংরা ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, ‘সাংবাদিক তোর পুটকি দিয়ে ভরে দেবো’। একজন চিকিৎসকের মুখে এমন কুৎসিত ও হিংস্র ভাষা সে সময় পুরো সাংবাদিক সমাজকে স্তম্ভিত করেছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মিশুর এই তথাকথিত ‘দেবতা’ সাজার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক মুখোশধারী ডেভিল। ডা. মিশু সে সময় ২৪০ জন সাধারণ কর্মীর প্রায় ১৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন। সেই তথ্য সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করার অপরাধে ওই রাতেই পুলিশের সঙ্গে এসে আমার বাড়িতে অভিযান চালায় মিশু। গভীর রাতে আমাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। ৪১ দিন টানা কারাবাস করেছি ওই ডাক্তারের অপকর্মের তথ্য প্রকাশ করার অপরাধে। আমার কারণে সেই টাকা তিনি হজম করতে পারেননি। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা পৌঁছে দিতে বাধ্য হন। সাংবাদিক আকতারুজ্জামান বলেন, “বিস্তারিত কখনো লেখা হয়নি, লিখলে হয়তো অনেকের মুখোশ খুলে যাবে। দেরিতে হলেও অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রত্যেকটি মানুষকেই তার কর্মের ফল ভোগ করতে হয়।”
বগুড়ার স্বাস্থ্য সেক্টরকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি এবং স্বৈরাচারী দলদাসত্বের মাধ্যমে চিকিৎসকদের হয়রানি করার মূল হোতা ছিলেন এই ডা. মিশু। তার গ্রেপ্তারের সংবাদে বগুড়ার সাধারণ মানুষ এবং বৈষম্যের শিকার চিকিৎসক মহলের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে। সচেতন মহল মনে করছেন, ডা. মিশুকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করলে ফ্যাসিস্ট আমলের বগুড়ার স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনেক চক্রান্তের জট খুলে যাবে।
