যেভাবে এগোচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। এই খেলাকে ঘিরে ৪৮ জাতির মহাউদযাপন। প্রায় ৮.৯ বিলিয়ন ডলার আয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে এতে। আয়োজনটি এতটাই বিশাল যে, এবার এটি যৌথভাবে আয়োজন করছে তিনটি দেশ। এর মধ্যে একটি দেশ আবার টুর্নামেন্ট শুরুর কয়েক মাস আগেই আরেকটি অংশগ্রহণকারী দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ-যুদ্ধের সব গভীর মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য চুকানোর পাশাপাশি-একটি অসম, এমনকি নজিরবিহীন প্রতিযোগিতার পরিবেশও তৈরি করেছে। এই বিশ্বকাপে অন্য ৪৭টি দলের তুলনায় ভ্রমণ-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়েছে ইরান জাতীয় দলকে। টুর্নামেন্টজুড়ে তাদেরকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া ও নিজেদের ঘাঁটি তিজুয়ানার মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত করতে হচ্ছে। তবু, রোববার বিশ্বের ১০ নম্বর র্যাঙ্কিংধারী দল বেলজিয়াম জাতীয় দলের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করার পরও ইরান এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তারা শুধু প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পেরোনোরই সুযোগ পাচ্ছে না। বরং গ্রুপ ‘জি’-এর শীর্ষস্থানও দখল করতে পারে।
ইরানের প্রতি এই আচরণ তাদের পারফরম্যান্সকে আরও বেশি প্রশংসার যোগ্য করে তুলেছে। একই সঙ্গে এটি এমন একটি টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। যে টুর্নামেন্টকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বলে দাবি করা হয়। পাশাপাশি দুই বছর পর লস অ্যানজেলেস অলিম্পিকের আয়োজক হওয়ার কথা থাকায়, বিশ্বকে বরণ করে নেয়ার ক্ষেত্রে সেই আয়োজন কীভাবে হবে- সেটি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, আবারও কি ব্যাপক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে? বৈশ্বিক একটি আসরে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা অতিথিদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর চেয়ে কি কূটনৈতিক সম্পর্ক এড়িয়ে যাওয়াই সহজ পথ হয়ে উঠবে?
আগের দুই বিশ্বকাপের আয়োজক রাশিয়া ও কাতার যখন সব দল ও সমর্থকদের জন্য ভিসা সহজ করতে পেরেছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র কেন পারেনি। এই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে। শুধু ইরান নয়, অংশগ্রহণকারী দেশ হাইতি, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের নাগরিকদের জন্যও ভিসা স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ইরাকের স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেইনকে শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে প্রায় সাত ঘণ্টা আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এছাড়া প্রশাসনের ১৫ জন কর্মকর্তাকে প্রবেশের অনুমতি না দেয়ার বিষয়টি বাদ দিলে, ইরান দলের সদস্যদেরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে কেবল ম্যাচের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। তাদেরকে আবার ম্যাচ শেষ হওয়ার দিনই দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এই ধরনের খামখেয়ালি বিধিনিষেধ- ম্যাচের ২৪ ঘণ্টা আগে অনুমতি মিলবে। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা আগে নয় কেন? এটি ইরান দলকে স্পষ্টতই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিয়েছে। তবে এই বিষয়টিই দলটিকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে বলে মনে করেন উইঙ্গার আলীরেজা জাহানবাক্স।
তিনি ম্যাচ শেষে বলেন, আমার মনে হয়, এসব পরিস্থিতি আমাদের আরও বেশি একত্রিত করেছে। আজ আমরা যে বিষয়টি দেখাতে পেয়েছি, তা হলো দলের অসাধারণ মানসিক শক্তি ও ঐক্য। আর এর একটি বড় অংশ এসেছে আমরা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেখান থেকেই।
দোভাষীর মাধ্যমে ইরানের কোচ আমির গ্যালেনই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বে দলটির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর আরও বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা ছয় মাস ধরে যুদ্ধাবস্থার মধ্যে ছিলাম। আমাদের ঘরোয়া লিগ বন্ধ ছিল। মনে আছে, একবার ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের একটি ম্যাচ খেলতে আমাদের স্থলপথে ৪০ ঘণ্টা ভ্রমণ করে অন্য দেশে যেতে হয়েছিল। ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যার কথা সবাই জানে। যুক্তরাষ্ট্রে আসার ক্ষেত্রে আমরা কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, সেটিও সবার জানা। দলের একটি অংশ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ছিল, আরেক অংশের ঘরোয়া লিগ যুদ্ধের কারণে স্থগিত ছিল। তাছাড়া আমাদের বিপক্ষে খেলার কথা ছিল এমন অনেক দলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচ বাতিল করেছে। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, আমরা সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বকাপে এসেছি। আমি চাই পুরো বিশ্ব এই বাস্তবতা জানুক। তবে এমন পরিস্থিতিতে থেকেও যেসব খেলোয়াড় বিশ্বকাপে নেমেছে, তারা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
ইরানের এই লড়াই যেন বিশ্বকাপের মৌলিক আদর্শের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা দেয়া নানা ঘটনার জোরালো জবাব। এটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, সরকার কিংবা ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ভুল করতে পারে, কিন্তু ‘সুন্দর খেলা’ ফুটবল তার শক্তি ও আবেদন হারায় না।
তাহলে ফিফার ভূমিকা কী ছিল?
ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যার স্লোগানই হলো ‘ফুটবল বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে’Ñতাদের অবস্থানই বা কোথায়? বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজনের এই মহাপরিকল্পনাকারী সংস্থা, যারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে স্পন্সর-সংযুক্ত স্টেডিয়ামের নাম পর্যন্ত বদলে সাধারণ ভৌগোলিক নামে রূপান্তর করতে পারে- যেমন গুগল ও অ্যাপল ম্যাপে সোফি স্টেডিয়াম-এর বদলে লস অ্যানজেলেস স্টেডিয়াম- তারা কি এসব বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধের ক্ষেত্রেও একই দৃঢ়তা দেখাতে পারত না?
বিশ্ব ফুটবলের অখণ্ডতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে ফিফা তার ক্ষমতা কতটা প্রয়োগ করেছে- সেই প্রশ্নই এখন উঠছে। খুব একটা নয়। সৌজন্যমূলক বক্তব্য আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তোষণমূলক আচরণ দেখা গেলেও কোনো নিষেধাজ্ঞা বা তার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। টুর্নামেন্টের ন্যায্যতা ও অখণ্ডতা ক্ষুণ্ন হওয়ার জন্য সম্ভাব্য কোনো শাস্তির ইঙ্গিতও মেলেনি। এমনকি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সমর্থকদের বর্ণবাদী আচরণের ঘটনায় ছয়টি জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে যে জরিমানা করেছিল ফিফা, তেমন কোনো ব্যবস্থাও এখানে নেয়া হয়নি।
কোনো নিষেধাজ্ঞাও দেয়া হয়নি। অথচ ১৯৮৮ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে বয়সসীমা অতিক্রম করা চারজন খেলোয়াড় খেলানোর দায়ে মেক্সিকোকে সব ধরনের ফিফা প্রতিযোগিতা থেকে বহিষ্কার করেছিল ফিফা। আবার ২০০৬ সালে ২০০২ বিশ্বকাপের এশিয়ান বাছাইপর্বে ইরানের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় মিয়ানমারকেও বাছাইপর্ব থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা চললেও ইরানের ফুটবল প্রতিনিধিরা মাঠের বাইরে তেমন স্বাধীনতা পাননি। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের আগে কিংবা তারও আগে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করা ম্যাচের প্রস্তুতির সময়ও তারা নিজেদের ইচ্ছামতো চলাফেরা বা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তবে মনে হচ্ছে, ২৬ জুন সিয়াটলে মিশরের বিপক্ষে হতে যাওয়া গ্রুপপর্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শেষ ম্যাচের আগে ইরান দল ভ্রমণ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা বেশি স্বাধীনতা পাবে। অন্তত শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমনটাই বিশ্বাস করেছিলেন ইরানের কোচ। তিনি বলেন, আমার প্রশ্ন হলো, প্রথম দুই ম্যাচের আগেও আমাদের কেন আগে আসতে দেয়া হয়নি? যদি এখন তারা এই ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে প্রথম ম্যাচ এবং এই ম্যাচের ক্ষেত্রেও কেন তা করেনি?
প্রশ্নগুলো যথার্থ।
আর বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক আসরে এমন প্রশ্ন আদৌ ওঠার কথা নয়।
