বাংলাদেশ বিশ্বকাপ দেখে না বিশ্বকাপে বাঁচে!

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ দেখে না বিশ্বকাপে বাঁচে!

ফন্ট সাইজ:

ভোর চারটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তখন হাজার-হাজার তরুণ-তরুণী গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। কেউ এসেছেন হলুদ-সবুজ জার্সি গায়ে। কেউ মাথায় পতাকা বেঁধে। বড় পর্দায় ব্রাজিলের ম্যাচ। গোল হলে আনন্দে লাফিয়ে উঠছে পুরো জনসমুদ্র। মিস হলে হাহাকার। এই দৃশ্য ও উন্মাদনা বাংলাদেশের অলি-গলি,পাড়া-মহল্লায়। এ ভালোবাসা কেবল বাংলাদেশের একার নয়, পুরো বিশ্বের। তার প্রতিচ্ছবি এখন ফিফার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে। বাংলায় ক্যাপশন দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা লিখেছে, ‘বাংলাদেশ বিশ্বকাপ দেখে না, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে বাঁচে।’

ফিফা বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল নেই। কখনো ছিল না। তবুও বিশ্বকাপ এলে এ দেশটা বদলে যায়। উন্মাদনায় ভরে উঠে। চায়ের কাপ থেকে শয়নঘর- সবখানে চলে বির্তক আর তুমুল আড্ডা। আর সেই অসাধারণ বাস্তবতাকেই এবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলো ফিফা। শুধু একটি পোস্ট নয়, দুটি আলাদা পোস্টে বাংলাদেশকে সম্মান জানিয়েছে সংস্থাটি। একটিতে ব্রাজিল সুপারস্টার ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোল উদযাপনের ছবিতে বাংলায় লেখা, ‘সাম্বার ছন্দ ফিরছে।’ সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকার ইমোজি। আরেকটি পোস্টে বাংলাদেশের হাজার হাজার সমর্থকের একসঙ্গে খেলা দেখার ছবি তুলে ধরা হয়েছে বিশ্ববাসীর সামনে। ১৯ ঘণ্টার মধ্যে সেই পোস্টটিতে ৫৫ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া জমা পড়ে। দেড় হাজার মন্তব্যের বেশিরভাগই বাংলায়। সেখানে লেখা, ‘আমরা গর্বিত।’ এই উন্মাদনা একদিনে তৈরি হয়নি। এর শিকড় অনেক গভীরে। বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখানো হয়। উদ্বোধনী ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হয় দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় পাওলো রসি-দিনো জফদের ইতালি। সেই প্রথম দেখায় ফুটবলের প্রেমে পড়ে যায় বাঙালি জাতি। তারপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই বাংলাদেশ একটু একটু করে আবেগের আরো গভীরে ডুবেছে। বাড়িতে পতাকা টাঙানো থেকে শুরু।

এখন সেটি রূপ নিয়েছে বিশাল র‌্যালিতে। রঙিন আলোকসজ্জায়, রাতজাগা উৎসবে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিকভাবেও নেই। কিন্তু তবুও এই দুই দেশ বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছে। কেন? উত্তরটা সহজ নয়। ম্যারাডোনা, জিকো, সক্রেটিসদের ফুটবল সৌন্দর্যই একসময় বাংলার মাটিতে সমর্থনের বীজ বুনেছিল। রোনালদো নাজারিওর ক্ষিপ্রতা, রোনালদিনহোর সৃজনশীল ফুটবল, লিওনেল মেসির জাদুতে সেই বীজ এখন মহিরুহ।

বিশ্বকাপ এলেই গ্রামের আইল পাশে বাঁধা হয় ব্রাজিলের পতাকা। শহরের ছাদে উড়তে থাকে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা রঙ। বাবা যে দলের সমর্থক, ছেলেও সেই দলেরই। এই ভালোবাসা উত্তরাধিকারের মতো বাহিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। ভিন্নতাও আছে। সমর্থনের রেশ ধরে হাতাহাতি, মৃত্যুর ঘটনা ঘটার নজিরও রয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাকের ঘটনা পর্যন্ত গড়িয়েছে। একসময় বাংলাদেশের এই উন্মাদনা শুধু দেশের মানুষই জানতো। কিন্তু এখন ইন্টারনেট সেই সীমানা ভেঙে দিয়েছে। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণজমায়েতে খেলা দেখার একটি ভিডিও শেয়ার করা হয় ব্রাজিল দলের অফিশিয়াল পেজে। সেই ভিডিওতে হাজারো তরুণের আবেগ দেখে অবাক হয়েছে গোটা বিশ্ব। ফিফার বিভিন্ন পোস্টেও বারবার উঠে এসেছে বাংলাদেশের ছবি। ঢাকার টিকাটুলির ‘ফিফা গলি’র ছবি পোস্ট করেছে ফিফা নিজেই। সেই ছবি ভাইরাল হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম আরো বিস্তৃত। একসময় শুধু ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এই উত্তেজনা। এখন পর্তুগাল, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্সের সমর্থকও এ দেশে কম নয়। মেসির অনুরাগীরা যখন আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকা হাতে রাস্তায় নামেন, রোনালদোর ভক্তরা তখন পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সিতে উদযাপনে মাতেন। এমবাপ্পের সমর্থকেরাও কম যান না। বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশ হয়ে যায় এক রঙিন ক্যানভাস। ফিফার এই স্বীকৃতি নিছক একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নয়। এটি একটি বার্তা। বিশ্বকাপে মাঠে না নামলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় বাংলাদেশ কারো চেয়ে কম নয়।

যে দেশের মানুষ রাত জেগে অন্য দেশের খেলা দেখে কাঁদে, গোল হলে পাড়া জাগিয়ে চিৎকার করে, প্রিয় দল হারলে পরদিন মনমরা হয়ে অফিসে যায়-সেই দেশের ফুটবলপ্রেমকে ‘পাগলামি’ বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটা সংস্কৃতি। এটা পরিচয়। ফিফা সেটাই বলেছে তাদের ভাষায়, ‘বাংলাদেশ বিশ্বকাপ দেখে না, বিশ্বকাপে বাঁচে।’ ফিফা বিশ্বকাপের হয়তো কোনো একদিন বাংলাদেশও খেলবে। শিরোপা জেতার স্বপ্নও মানুষ দেখবে। কিন্তু এই মাটির মানুষের হৃদয়ে এখন ফুটবলের যে আগুন জ্বলে, সেটা কোনো ট্রফির চেয়ে কম মূল্যবান নয়। বিশ্ব ফুটবল সংস্থা নিজেই এসে বলছে, তোমাদের ভালোবাসাই আসল বিশ্বকাপ। আর সেটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন