গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে প্রত্যেক গ্রুপের শেষ দু’টি ম্যাচ মাঠে গড়াচ্ছে একই সময়ে। এর কারণ ফুটবল ইতিহাসের কলঙ্কজনক ৯০ মিনিটের একটি উপাখ্যান। ১৯৮২ সালের ২৫শে জুন। স্পেনের গিহোনের এল মোলিনোন স্টেডিয়াম। সেদিন পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচটি ইতিহাসে ‘গিহোনের কলঙ্ক’ হিসেবে পরিচিত। একই গ্রুপের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে হওয়ার গল্পটাও সেখান থেকেই শুরু। সেই বিশ্বকাপে নবাগত আলজেরিয়া প্রথম ম্যাচেই পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয়। জার্মানি তখন ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন, বিশ্বমঞ্চের অন্যতম পরাশক্তি। তাদের এক খেলোয়াড় মন্তব্য করেছিলেন, সিগার ফুঁকতে ফুঁকতেও নাকি আলজেরিয়াকে হারানো যাবে। সেই অহংকারের জবাব দিয়েছিল মরুভূমির শিয়ালেরা।
গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচ শেষে আলজেরিয়ার ছিল চার পয়েন্ট। কিন্তু আলজেরিয়ার শেষ ম্যাচের পরেই পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া জেনে যায়, কোন স্কোরলাইনে তারা দুই দলই পরের রাউন্ডে যেতে পারবে। পরদিন গিহন স্টেডিয়ামে ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় পশ্চিম জার্মানি গোল করে এগিয়ে যায়। এরপর পুরো ৮০ মিনিট ছিল নিষ্প্রাণ পাস খেলার এক মঞ্চনাটক। কেউ গোল করতে চাইছিল না, কেউ কাউকে আক্রমণ করছিল না। সেই ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে গোলে মাত্র দুটি শট ছিল। বিশ্বকাপের ৬০ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়ার্ধে গোলে এত কম শট আর কখনোই হয়নি। ৫৪তম মিনিটের পর পুরো ৪০ মিনিট নেওয়া হয়নি একটি শটও। দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলের মোট পাসের ৫৮ শতাংশই ছিল নিজেদের অর্ধে। অথচ বিশ্বকাপের স্বাভাবিক গড় এ ক্ষেত্রে মাত্র ৪১ শতাংশ।
গ্যালারিতে স্প্যানিশ দর্শকেরা চিৎকার করছিলেন ‘ফুয়েরা! ফুয়েরা!’ (বেরিয়ে যাও!)। আলজেরীয় সমর্থকেরা ক্ষোভে টাকার নোট নাড়ছিলেন, ম্যাচ বিক্রির অভিযোগে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। জার্মান সমর্থকদের মধ্যে একজন তো নিজ দেশের পতাকাই জ্বালিয়ে দেন। স্প্যানিশ এক পত্রিকায় সেদিনের ম্যাচ প্রতিবেদন খেলার পাতায় নয়, ছাপা হয়েছিল অপরাধবিষয়ক পাতায়। এমনকি জার্মানির এক সংবাদপত্রও লিখেছিল জার্মানির লজ্জা হওয়া উচিত। জার্মান ধারাভাষ্যকার এবেরহার্ড স্তানিয়েক সরাসরি বলেছিলেন, ‘যা হচ্ছে তা লজ্জাজনক। ফুটবলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’ অস্ট্রিয়ান ধারাভাষ্যকার রবার্ট সিগার দর্শকদের টেলিভিশন বন্ধ করে দিতে বলেছিলেন। আলজেরিয়া ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিল। আইন অনুযায়ী পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া কোনো ‘অপরাধ’ না করায় ফিফা কোনো শাস্তি দিতে পারেনি। কিন্তু এরপর ফিফা নেয় বড় এক সিদ্ধান্ত, পরবর্তী সব বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ দুটি ম্যাচ একই সময়ে খেলা হবে, যে নিয়ম চালু আছে এখনো।
