ম্যাচের শেষ বাঁশিটা বাজার ঠিক পরের মুহূর্ত। মাঠের সব আলো, গ্যালারির ৬০ হাজার জোড়া চোখ আর সম্প্রচারকারী টেলিভিশনের ক্যামেরা তখন একজনের ওপর স্থির। ৪১ বছর ১৩৮ দিন বয়সী এক ‘বুড়ো’! ইটের দেয়ালের মতো শক্ত চোয়াল নিয়ে লেন্সের দিকে সোজাসুজি তাকালেন। চোখে সেই চেনা ক্ষোভ, চেনা জেদ। ক্যামেরা লক্ষ্য করে চিৎকার করে উঠলেন, “আই’ম ব্যাক, আই’ম ব্যাক!” নাম তার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস আভেইরো। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্র্যান্ড, আবার সবচেয়ে বড় ট্রোল-মেটেরিয়াল। সেসবের জবাবটা যে তাকে এভাবেই দিতে হতো।
ব্রাজিলের বর্তমান কোচ ও রোনালদোর সাবেক গুরু কার্লো আনচেলোত্তি একবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘রোনালদোর চেয়ে ভয়ঙ্কর আরেকজন আছে। কে? তিনি আগের ম্যাচে গোল না পাওয়া রোনালদো।’ ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে আগের ম্যাচে ম্যাড়মেড়ে একটা ড্রয়ের পর গত সাত দিন ফুটবল দুনিয়া তাকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই লিখেছে। ‘ও এখন দলের বোঝা ’, ‘পর্তুগালের হারানো গৌরব ’, ‘সৌদি প্রো লিগে খেলে সময় নষ্ট করা এক সাবেক ফুটবলার ’। সমালোচনার ধারালো ছুরিগুলো যখন তার ফুটবলীয় অস্তিত্বকে প্রায় কেটেকুটে শেষ করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই উজবেকিস্তানের রক্ষণভাগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে রাজকীয় এক জোড়া গোল করলেন রোনালদো। সেই সঙ্গে পৃথিবীর একমাত্র পুরুষ
ফুটবলার হিসেবে গড়লেন টানা ছয়টি বিশ্বকাপে (২০০৬ থেকে ২০২৬) গোল করার এমন এক হিমালয়সম কীর্তি। তবে গল্পটা শুধু এই দুটি গোলের বা এমনসব রেকর্ডের নয়। রেকর্ড তৈরি হয় ভাঙার জন্যই। গল্পটা হলো সেই অনন্তকালের সত্যের, যা ২৩ বছর ধরে ফুটবল বিশ্ব দেখে আসছে। কিন্তু রোনালদোকে মারার জন্য সমালোচনা যে কোনো বিষ নয়, বরং তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন! ২০০৬ সালের সেই তরতাজা তরুণকে মনে আছে? ওয়েন রুনিকে লাল কার্ড দেখানোর পর ক্যামেরায় দেয়া সেই এক চোখের ইশারা। বৃটিশ মিডিয়া তো পারে না তাকে গিলে খেয়ে ফেলে।
ওল্ড ট্রাফোর্ডের গ্যালারিতে যখনই সে বল ছুঁতো, দুয়োধ্বনিতে কান পাতা দায় হতো। সবাই বলছিল, ইংল্যান্ডে নাকি রোনালদোর ক্যারিয়ার শেষ। জবাব? পরের দুই মৌসুমে প্রিমিয়ার লীগ আর চ্যাম্পিয়ন্স লীগ উঁচিয়ে, ব্যালন ডি’অরটা বগলদাবা করে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমিয়েছিলেন। মাদ্রিদে যাওয়ার পর বলা হলো, ‘উদ্ধত ’, ‘টাকার লোভী ’, ‘ডাইভ দেয়া প্লেয়ার ’। ন্যু ক্যাম্পের গ্যালারি যখন তার উদ্দেশ্যে গালি ছুড়তো, তিনি হাত নামিয়ে বলতেন, ‘কালমা, কালমা (শান্ত হও, আমি আছি)।’ এই সেলিব্রেশন এতটাই প্রোভোকিং, যে একসময় তা ব্যান করতে বাধ্য হয় ফুটবলের হর্তাকর্তারা। চ্যাম্পিয়ন্স লীগে টানা হ্যাটট্রিক করে, উরুর পেশি দেখিয়ে সে
প্রতিবার সমালোচকদের স্তব্ধ করেছে। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে যখন জুভেন্টাস, কিংবা ওল্ড ট্রাফোর্ডে দ্বিতীয় দফায় ফেরা, প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে মিডিয়া তার এপিটাফ লিখতে বসেছে। পর্তুগিজ নায়ক একগাল হেসে প্রতিবার সেই এপিটাফের ওপর নিজের বুট চালিয়েছেন। রোনালদোর ভাষায় গত সপ্তাহটাও ছিল তেমনই এক ‘কঠিন ও অন্ধকার ’। লিওনেল মেসি যখন আগের দিন রেকর্ড গড়ে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৮) হলেন, তখন মিডিয়ার পুরো স্পটলাইট চলে গেল রোনালদোর ১০ ম্যাচের গোলখরা আর ৪১ বছরের বয়সের ওপর।
মনে হচ্ছিল, মিডিয়া যেন তাকে অবসরে পাঠিয়েই ছাড়বে! রোনালদো নিজেই ম্যাচ শেষে বুক খালাস করে বললেন, “মনে হচ্ছিল আমি যেন ফুটবল থেকেই অবসর নিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমি বরাবরের মতোই হাল ছাড়িনি। যখনই কোনো কিছু ঠিকঠাক যায় না, তখনই রব ওঠে, ‘ক্রিস্টয়ানো শেষ, ও বুড়ো হয়ে গেছে।’ তবে যাক, আমি আর আমার সতীর্থরা মিলে এর একটা ভালো জবাব দিতে পেরেছি।” উজবেকিস্তানের কোচ ফ্যাবিও ক্যানাভারো, যিনি নিজে ডিফেন্সের ব্যাকরণ শিখিয়েছেন দুনিয়াকে। ম্যাচের পর একটা অমোঘ সত্য উচ্চারণ করেছেন এই ইতালিয়ান কিংবদন্তি, বলেছেন, ‘পেনাল্টি বক্সে ওকে এক সেন্টিমিটার জায়গাও দেয়া পাপ। অনেকেই মনে করেন এশিয়ায় খেলা আসলে সময় নষ্ট করা। কিন্তু এরপর ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপে এসে এভাবে খেলা প্রমাণ করে যে তোমার ভেতরের ক্ষুধাটা এখনো কতোটা জ্যান্ত।’ ম্যাচের প্রথমার্ধেই জোয়াও ক্যানসেলোর নিখুঁত কাটব্যাক থেকে যে হাফ-ভলিটা রোনালদো করলেন, তা যেন ছিল সমালোচকদের মুখে এক সপাটে চপেটাঘাত।
‘দলের জন্য না খেলা’ রোনালদো ছুটে গেলেন ডাগআউটের সতীর্থদের দিকে, উচ্ছ্বাস আছড়ে পড়লো গোটা স্টেডিয়ামে। আর দ্বিতীয় গোলে ব্রুনো ফার্নান্দেসের পাসে যে কোনাকুনি ফিনিশিং- তাতে ৪১ বছরের কোনো ক্লান্তি ছিল না, ছিল ২৩ বছরের এক জাত শিকারির নিখুঁত নিশানা। এমনকি নুনো মেনদেসের ফ্রি-কিক গোলের কৃতিত্বও কিছুটা রোনালদোকে দেয়া যায়। উজবেক খেলোয়াড় ও গোলকিপার যখন পর্তুগিজ অধিনায়কের শট সামলাতে প্রস্তুত, তখন সবাইকে চমকে দিয়ে বাঁ পায়ে জাল কাঁপালেন মেনদেস। গোলকিপারের হাতের পাশ দিয়ে গেলেও, বল থামানোর চেষ্টাটুকু করার সময়ও পাননি। ম্যাচের পর মিক্সড জোনে প্রশ্নের সঙ্গে মেসিকে জড়াতে গেলেই রোনালদো বললেন, ‘নেক্সট কোয়েশ্চেন।’ কারণ তিনি জানেন, তার লড়াইটা অন্য কারো সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গে। লড়াইটা সর্বোপরি সময়ের সঙ্গে এবং তাকে টেনে নিচে নামাতে চাওয়া ওই মিডিয়া সার্কাসের সঙ্গে।
