পূর্ণতা পেলো বিশ্বকাপ! স্বরূপে ফিরলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। গোল করলেন, ইতিহাস গড়লেন! গতকাল উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে হারায় পর্তুগাল। হিউস্টন স্টেডিয়ামে এই ম্যাচে জোড়া গোল করেন রোনালদো। ঘষামাজা করেন রেকর্ড বুক। ‘কে’ গ্রুপে এটি পর্তুগালের প্রথম জয়। দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে অনেকটাই স্বস্তি ফিরলো পর্তুগিজ শিবিরে। আগের ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছিল তারা।
মেসি, এমবাপ্পে, হালান্দ, কেইন, ভিনিসিউসরা আছেন সুপার ফর্মে। রোনালদো কেমন করেনÑ অপেক্ষায় ছিল ফুটবল বিশ্ব। প্রথম ম্যাচে ঝলক দেখাতে পারেননি রোনালদো। তবে কথায় আছেÑ ‘ফর্ম ইস টেম্পোর্যারি ক্লাস ইস পারমানেন্ট।’ গতকাল ভক্ত-সমর্থকদের আনন্দে মাতান রোনালদো। নিজের মাথার ওপর থেকেও সরালেন বিশাল চাপ। ম্যাচের শুরুতেই সুযোগ আসে রোনালদোর সামনে। চতুর্থ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে ক্রস করেন নুনো মেন্ডেস। কিন্তু ছোট বক্সে বলে পা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন রোনালদো। দুই মিনিট পরই ডেডলক ভাঙেন সিআরসেভেন। জোয়াও ক্যানসালোর দারুণ পাসে ট্যাব করে জালে জড়ান বল।
উজবেকিস্তান গোলরক্ষক আবদুভোখিদ নেমাতভের চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না। উদযাপন থেকে বোঝা যায় রোনালদো কতটা চাপে ছিলেন। গোল করেই তিনি ছুটে যান বেঞ্চের সতীর্থদের দিকে। চলে লম্বা সেলিব্রেশন। এ গোলের মাধ্যমে এক রেকর্ডে লিওনেল মেসিকে ছাড়িয়ে গেলেন রোনালদো। পৃথক ৬ বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড় তিনি। ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলছেন মেসিও। তবে মেসি গোল পেয়েছেন বিশ্বকাপের পাঁচটি আসরে। দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজিত ২০১০ বিশ্বকাপে গোল করতে পারেননি মেসি। পর্তুগালের জার্সি গায়ে ১০ ম্যাচ পর গোলের দেখা পেলেন সিআর সেভেন। ক্যারিয়ারে এটি তার দীর্ঘতম গোল খরা।
১৭তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে পর্তুগাল। উজবেকিস্তানের ডি বক্সের মাথা থেকে ফ্রিকিকে গোল করেন নুনো মেন্ডেস। ২৯তম মিনিটে পর্তুগাল ডি বক্সের বাইরে থেকে বুলেট শটে বল জালে জড়ান উজবেক তারকা আজিজ গানিয়েভ। তবে ভিএআর পর্যালোচনা করে ফাউলের দায়ে গোল বাতিল করেন রেফারি। গোলের আগে পর্তুগিজ তারকা জোয়াও ক্যানসালোকে ফাউল করেন আজিজ। ৩৯ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাস থেকে দারুণ ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় ও পতুর্গালের তৃতীয় গোল আদায় করেন রোনালদো। এতে তিনি ভেঙে দেন স্বদেশি কিংবদন্তি ইউসেবিওর রেকর্ড।
পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলে সবার ওপরে এখন রোনালদো। ইউসেবিওর ৯ গোল ছাড়িয়ে রোনালদোর গোল এখন ১০। ম্যাচের ৫৩তম মিনিটে বাম প্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে জোরালো শট নেন উজবেক তারকা ফায়জুল্লায়েভ। কিন্তু বল যায় সরাসরি পর্তুগিজ গোলরক্ষক দিয়েগো কস্তার গ্রিপে। ৫৮ মিনিটে রোনালদো তৃতীয় গোল পেয়ে যেতে পারতেন । ফ্রিকিক থেকে ব্রুনো ফার্নানদেজের চিপ ডি বক্সের ভেতরে ফাঁকায় পেয়ে যান আগুয়ান রোনালদো। তবে গোলরক্ষক সময় মতো বেরিয়ে রুখে দেন রোনালদোকে। পরের মিনিটেই গোলের হালি পূর্ণ করে পর্তুগাল। কর্নার থেকে জটলায় জোয়াও ফেলিক্সের পায়ে লেগে বল যায় ছোট ডি বক্সে। এক উজবেক ডিফেন্ডারের গায়ে লাগার পর গোলরক্ষকের হাত ছুঁয়ে জাল স্পর্শ করে বল। আত্মঘাতী গোল।
দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেক শেষে পরপর দুটি সুযোগ পান রোনালদো। প্রথমটি বাইরে মারেন আর পরে রোনালদোর বুলেট শট ফিরিয়ে দেন উজবেক গোলরক্ষক। ৮৮তম মিনিটে জোরালো শটে পর্তুগালের পঞ্চম গোলটি করেন রাফায়েল লিয়াও। ম্যাচের শেষ কিকটি রোনালদো পোস্টের বাইরে মারলে হ্যাটট্রিকের আফসোস থেকে যায় ভক্তদের।
হিউস্টন স্টেডিয়ামে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচের পুরো ৯০ মিনিটে মাত্র ২৫ বার বল টাচ করেছিলেন রোনালদো। প্রতিপক্ষের গোলবারে দু’বার শট নেন আর দুটিই ছিল লক্ষ্যভ্রষ্ট। ওই ম্যাচে ১-১ গোলের ড্রতে পয়েন্ট খোয়ায় পর্তুগাল। পরে রোনালদোর কড়া সমালোচনা করেন থিয়েরি অঁরি। ফ্রান্সের সাবেক ফরোয়ার্ড বলেন, ‘রোনালদা নিজের জন্য খেলছিল। নিজে গোল করতে চাইছিল। অথচ দলের গোল প্রয়োজন।’ প্রশ্ন ওঠে পুরো ৯০ মিনিট রোনালদোকে খেলানো নিয়েও। তবে পর্তুগালের স্প্যানিয়ার্ড কোচ রবার্তো মার্টিনেজ বলেছিলেন, ‘পর্তুগালের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে কিভাবে আমি মাঠ থেকে তুলে নেবো যেখানে দলের গোলের দরকার।’
রোনালদো অবশেষে কোচের আস্থার প্রতিদান দিলেন সদর্পে। বিশ্বকাপে দ্বিতীয় বয়োজ্যষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে গোল পেলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। এমন শীর্ষ রেকর্ডটি ক্যামেরুন তারকা রজার মিলার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ৪২ বছর বয়সে গোল করেন মিলা। চার দিন আগে হিউস্টনে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই এক রেকর্ড গড়েন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো দলের একাদশের হয়ে মাঠে নামা সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড় রোনালদো। সেদিন রোনালদোর বয়স ছিল ৪১ বছর ১৩২ দিন। আগের রেকর্ডটি ছিল কানাডার আতিবা হাচিনসনের। ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ৩৯ বছর ২৯২ দিন বয়সে মাঠে নামেন সাবেক এ মিডফিল্ডার। টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসির এক রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন মেসিও। মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়ারও এটি ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। তবে গোলরক্ষক ওচোয়া দুটি বিশ্বকাপে মাঠে নামার সুযোগ পাননি, খেলেননি এবারের শুরুর দুই ম্যাচও।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি রোনালদোর। পর্তুগালের জার্সি গায়ে ২৩০ ম্যাচে তার ১৪৫ গোল, ৪৬টি অ্যাসিস্ট।
