মেসি-এমবাপ্পে যুদ্ধ, জিতবে কে?

মেসি-এমবাপ্পে যুদ্ধ, জিতবে কে?

ফন্ট সাইজ:

কাতার বিশ্বকাপে নানা চাপ নিয়ে খেলেছিলেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ না পাওয়ার ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ আরও কতো চাপ। তার ওপরে আবার সৌদি আরবের সঙ্গে দুই গোলে হার দিয়ে আসর শুরু করা। যদিও এসব চাপ-তাপ একপাশে রেখে ঠিকই বিশ্বকাপটা নিজের করে নিয়েছিলেন এই আর্জেন্টাইন তারকা। এরপর মাঝের সাড়ে তিন বছর মেসিকে নিয়ে কতো শত আলোচনা। তিনি কি আদৌ বিশ্বকাপে খেলবেন? খেললেও কি আগের সেই জাদু দেখাতে পারবেন? কারণ তার বয়স বেড়েছে। তবে কিংবদন্তিদের বয়স বাড়ে কিন্তু জাদু ফুরোয় না।

চলতি বিশ্বকাপে মেসি তাই প্রমাণ করেছেন। দুই ম্যাচে তিনি শুধু খেলেননি, রীতিমতো ফুটবল পায়ে নতুন করে রাঙাতে শুরু করেছেন বিশ্বকাপ। আলজেরিয়ার জালে তিনবার বল পাঠিয়েছেন, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে যোগ করেছেন আরও দুই গোল। আজ ২৪শে জুন মেসির ৩৯তম জন্মদিন। জন্মদিনের একদিন আগে মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে ১৮ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের রেকর্ড গোলদাতার চূড়ায় এখন মেসি। নিজের জন্মদিনে ভক্তদের উদ্দেশ্যে এর চেয়ে ভালো উপহার আর কী হতে পারে? যে রাতে মেসি ক্লোসাকে ছাড়িয়েছেন, সেই রাতেই জোড়া গোল করে ক্লোসাকে স্পর্শ করেছেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে মেসির পাঁচ গোলের বিপরীতে এমবাপ্পের গোল সংখ্যা ৪। বিশ্বকাপে দু’জনের গোলসংখ্যা ১৮ ও ১৬।

বিশ্বকাপে মেসি-এমবাপ্পের লড়াইটা আসলে কাতার থেকে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের আগ পর্যন্ত সমান পাঁচ গোল ছিল দু’জনের। ফাইনালে আর্জেন্টিনা জিতলেও হ্যাটট্রিক করেন এমবাপ্পে। মেসি করেন জোড়া গোল। আট গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট জিতলেন এমবাপ্পে। মেসির ছিল ৭ গোল। এবারো ২৭ বছরের এমবাপ্পের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গোল করছেন মেসি। এরই মধ্যে দুই ম্যাচে করে ফেলেছেন পাঁচ গোল।

অস্ট্রিয়া ম্যাচে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬ গোল) পেছনে ফেলেছেন মেসি। একইসঙ্গে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন নারী বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের কিংবদন্তি মার্তার সর্বোচ্চ ১৭ গোলের রেকর্ডকেও। এখন পুরুষ ও নারী- উভয় বিশ্বকাপ মিলিয়ে ইতিহাসের সর্বকালের একক সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসি (১৮ গোল)। তবে মাত্র ২৭ বছর বয়সেই ১৬ গোল নিয়ে মেসির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে ম্যাচ জয়ের দিক থেকেও মেসি এখন বিশ্বের সেরা। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয়টি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ১৮তম জয়। ২০০৬ সালে সার্বিয়ার বিপক্ষে ৬-০ গোলের জয় দিয়ে শুরু করে ২০২৬-এ এসে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৭টি ম্যাচ জয়ের রেকর্ড। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালেই জার্মানির লোথার ম্যাথিউসের ২৬ ম্যাচের রেকর্ড ভেঙেছিলেন মেসি। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমে বিশ্বকাপে নিজের ম্যাচ সংখ্যাকে অনন্য এক উচ্চতায় (২৮ ম্যাচ) নিয়ে গেলেন। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনির ২ হাজার ২১৭ মিনিটের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।

ডালাস স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পুরো ১০০ মিনিট মাঠে থাকায় বিশ্বকাপে মেসির মোট খেলার সময় দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২ হাজার ৪৮৯ মিনিটে! এখানেও তিনি অনন্য। তবে এসব রেকর্ডের ধারে কাছে এমবাপ্পে না থাকলেও বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ডে মেসির সঙ্গে ভালোভাবেই লড়াইয়ে আছেন। সোমবার রাতে মেসি যেখানে শেষ করেছেন, এমবাপ্পে ঠিক শুরু সেখানেই। ডালাস থেকে ২৩৫৭ কিলোমিটার দূরে ফিলাডেলফিয়ায় এমবাপ্পে জোড়া গোল করে ক্লোসার পাশে বসেন। বজ্রঝড়ের রাতে ইরাকের বিপক্ষে এমবাপ্পে দুই গোল করে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ১৬। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’ সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে যৌথভাবে দুইয়ে ক্লোসা-এমবাপ্পে।

১৫ গোল করে তিনে রোনালদো। মেসি সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার আগেই কিন্তু তাকে টপকে গিয়েছিলেন এমবাপ্পে। তাতে হয়তো অনেকের মনে হতে পারে, এমবাপ্পে হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসেছিলেন। তবে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ১৬ই জুন রাতে নিউ ইয়র্কে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের গোলসংখ্যা ১৪ বানিয়ে ফেলেছিলেন এমবাপ্পে। তখন মেসির গোল ছিল ১৩। ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা পর কানসাস সিটিতে মেসি হ্যাটট্রিক করায় বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা হয়ে যায় ১৬। আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচ বাংলাদেশ সময় সকালে হলেও কানসাসের স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাতেই হয়েছিল এই ম্যাচ। ক্লোসা-রোনালদো অবসর নিয়েছেন আরও আগেই। ক্লোসা সবশেষ বিশ্বকাপ খেলেছেন ২০১৪ সালে।

শেষটা তার হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন হয়েই। ১২ বছর আগে মারাকানায় আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল জার্মানি। আর রোনালদো ২০০৬ বিশ্বকাপে শেষবারের মতো খেলেছেন। দুটি বিশ্বকাপও জিতেছেন তিনি। তবে মেসি-এমবাপ্পের গোলের ব্যবধান মাত্র ২ হওয়ায় তাদের লড়াইটা হবে উপভোগ করার মতোই। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়ে মেসির চেয়ে এমবাপ্পের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। যেখানে কানসাস সিটিতে ১৭ই জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর মেসির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ২০৩০ বিশ্বকাপে তিনি খেলবেন কিনা। আর্জেন্টাইন তারকা ফরোয়ার্ড সরাসরি না করে দিয়েছেন।

তবে এমবাপ্পের বয়স মাত্র ২৭। চোট বাধা হয়ে না দাঁড়ালে এই বিশ্বকাপের পরও কমপক্ষে দুটি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ রয়েছে। যদি ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তাহলে সংখ্যাটাকে বহুদূর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা নিশ্চিতভাবেই করবেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। এমন দিনে মেসি রেকর্ডটা গড়েছেন, যে দিনটা ছিল দিয়াগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গডের’ ৪০ বছর পূর্তি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হয়েছিল ম্যারাডোনার সেই অবিস্মরণীয় গোল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন