ফিলিস্তিনি প্রতীকে ভরে উঠলো গ্যালারি

জর্ডান-আলজেরিয়া ম্যাচ

ফিলিস্তিনি প্রতীকে ভরে উঠলো গ্যালারি

ফন্ট সাইজ:

চারদিক জুড়ে চোখে পড়ছিল স্কার্ফ, আর সেগুলোর মধ্যে ছিল স্পষ্ট ফিলিস্তিনের ছাপ। ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারার লেভি’স স্টেডিয়ামে সোমবার রাতে জর্ডান ও আলজেরিয়ার ম্যাচ চলাকালে দর্শকদের কাঁধে ঝোলানো বা মাথায় পেঁচানো স্কার্ফগুলো ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

জর্ডান এর আগে কখনো বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার সুযোগ পায়নি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে নেমে দেশটি রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি কিছুর প্রতিনিধিত্ব করছে। জর্ডানের বহু নাগরিকের শিকড় ফিলিস্তিনি পরিবার থেকে এসেছে। বর্তমানে জর্ডানে ২৩ লাখেরও বেশি নিবন্ধিত ফিলিস্তিনি শরণার্থী বসবাস করছে।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ শুধু জর্ডানের খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আলজেরিয়ার ফুটবল দল তাদের বিশ্বকাপ যাত্রায় ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির দৃশ্য দেখিয়েছে। গত অক্টোবরে সোমালিয়ার বিপক্ষে জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করার সময় দলটি মাঠে ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শন করেছিল।

ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা সাধারণত বিশ্বকাপের মঞ্চে রাজনৈতিক বার্তা বা প্রতীক প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে। তবে ফিলিস্তিনি ফুটবল ফেডারেশন ফিফা’র ২১১ সদস্য দেশের একটি হওয়ায়, সমর্থক, কর্মকর্তা এবং খেলোয়াড় সবাই এই প্রতীকগুলো যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা- বিশ্বকাপ আয়োজনকারী এই তিন দেশে অনুষ্ঠিত ভেন্যুগুলোতে বহন করার অনুমতি পাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনি প্রবাসীদের সংখ্যা আনুমানিক ছয় মিলিয়নেরও বেশি- যার মধ্যে লেবানন, সিরিয়া ও মিশরে উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী রয়েছে। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডিয়ারবর্ন শহর এবং চিলির সান্তিয়াগোতেও তাদের বড় উপস্থিতি রয়েছে। সেখানে একটি ফুটবল ক্লাবও ফিলিস্তিনি জনগণের নামে নামকরণ করা হয়েছে। তাই সোমবারের ম্যাচটি আলজেরীয় ও জর্ডানীয়দের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল।
পোস্টডক্টরাল শিক্ষার্থী হানিয়া তাহা এদিন সকালে একেবারে শেষ মুহূর্তে ভার্জিনিয়া থেকে ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়ার টিকিট ও ফ্লাইট কেনার সিদ্ধান্ত নেন। জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করা তাহা গর্বের সঙ্গে জর্ডান ও ফিলিস্তিন উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত রঙ পরিধান করেছিলেন।

তার মাথায় ছিল একটি কাফিয়া, যা কালো-সাদা চেকের একটি কাপড়। এটি ফিলিস্তিনি পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠে। এ ছাড়া তার কাঁধের ওপর ঝোলানো ছিল একই রকম আরেকটি কাফিয়া। সেটি ছিল জর্ডানের সুস্পষ্ট প্রতীক লাল ও সাদা রঙের।

সান হোসেতে দলের হোটেলের বাইরে গান গেয়ে স্বাগত জানানো একদল ভক্তের সঙ্গে যোগ দিয়ে তাহা বলেন, আমি ফিলিস্তিনি এবং জর্ডানকে সমর্থন করতে এসেছি। এ কারণেই আমি দুটোই পরেছি।

জর্ডানের শাসক রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এদিন আকস্মিকভাবে ম্যাচটি দেখতে স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিলেন। তিনি স্টেডিয়ামের এক কর্নার বক্সে বসেছিলেন। সেই সময় নিজার আল রাশদান জর্ডানকে অপ্রত্যাশিত লিড এনে দিলে স্টেডিয়াম মুহূর্তেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে।

জানা যায়, রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ’র স্ত্রী রানী রানিয়া কুয়েতে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার পরিবার ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। তার সৎ ভাই প্রিন্স আলি বিন আল হুসেন, যার প্রয়াত মা আলিয়া ছিলেন ফিলিস্তিনি, দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি।
গাজাযুদ্ধে আহত কিছু গাজাবাসী যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। গত রোববার তারা যখন জর্ডানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রিন্স আলি।
ইসরাইল ও গাজা যুদ্ধ বিষয়টিও কিছু সমর্থকের মনেও গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। পশ্চিম তীরের রামাল্লায় জন্ম নেয়া ২৪ বছর বয়সী ওমর খালিদ ক্যালিফোর্নিয়ায় এসেছেন একটি টি-শার্ট পরে। তার টি-শার্টে ফিলিস্তিনি ফুটবলের অন্যতম শ্রদ্ধেয় খেলোয়াড় সুলেইমান আল-ওবেইদের ছবি ছিল। ওই খেলোয়াড় ২০২৫ সালে দক্ষিণ গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত হন।

খালিদ বলেছেন, তিনি খুব ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। বাবার সঙ্গে ম্যাচ দেখতে আসা খালিদ আরও বলেন, আমরা দুইটি আরব দলের খেলা দেখতে চেয়েছিলাম, এবং আমরা দুই দলকেই সমর্থন করি।
সোমবারের ম্যাচে যখন দুই দলের খেলোয়াড়রা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলন তখন দর্শকদের আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুই পক্ষের সমর্থকেরাই একে অপরের জাতীয় সংগীতের সময় করতালি ও উচ্ছ্বাসে অংশ নেয়।
এর আগে আলজেরিয়ার ম্যাচেও দেশটির সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হন ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান দেয়ার কারণে।

সান ফ্রান্সিসকোর ২২ বছর বয়সী সাল জুদেইহ বলেন, আমরা দুই দেশকেই ভালোবাসি, আমরা চাই দু’দলই জিতুক। আমরা রামাল্লা থেকে আসা একটি পরিবারের সন্তান। আমরা একই।
জর্ডান ও আলজেরিয়ার মধ্যে আনুগত্যের বিভাজন শুধু সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না- তা রাজপরিবারের ভেতরেও গভীরভাবে বিস্তৃত হয়েছিল। প্রিন্স আলির স্ত্রী রিম আলি হলেন সাবেক আলজেরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ জাতিসংঘ কর্মকর্তা লাখদার ব্রাহিমির কন্যা।

প্রিন্স আলি জানান, তার স্ত্রীকে জর্ডানের পক্ষে আনতে রাজি করানো তার জন্য সহজ ছিল, কিন্তু শ্বশুরের ক্ষেত্রে তা আরও কঠিন ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাচে আলজেরিয়াই জয় পায়, পিছিয়ে থেকে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ গোলে জর্ডানকে পরাজিত করে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন