বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ সম্পর্কে রুশনারা আলী, রুপা, টিউলিপ ও আফসানার মন্তব্য

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ সম্পর্কে রুশনারা আলী, রুপা, টিউলিপ ও আফসানার মন্তব্য

ফন্ট সাইজ:

 বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণায় দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশি বংশেদ্ভুত লেবার পার্টির এমপি রুশনারা আলি ও রুপা হক। উভয়ই তাদের ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে বিবৃতি প্রকাশ করেন। রুশনারা আলি লিখেছেন, আমি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কিয়ের স্টারমারকে চিনি। তার প্রধানমন্ত্রিত্ব এভাবে শেষ হওয়ায় আমি গভীরভাবে দুঃখিত। পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিষ্ঠা এবং আমাদের দেশ ও আমাদের দলের প্রতি তার অঙ্গীকারেরই প্রমাণ। লেবার পার্টির নেতা হিসেবে তিনি আমাদের দলকে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয় থেকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছেন। ১৪ বছরের বিরোধী দলীয় অবস্থানের অবসান ঘটিয়েছেন। তিনি এবং আমাদের উভয়েরই গর্ব করার মতো অনেক অর্জন রয়েছে। তার নেতৃত্বে লেবার সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করেছে, মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার কমিয়েছে, বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ডের বিনিয়োগ এনেছে, এনএইচএস-এর চিকিৎসা অপেক্ষার তালিকা কমিয়েছে, কর্মজীবী মানুষের নতুন অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করেছে, সামাজিক ও সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন খাতে রেকর্ড বিনিয়োগ করেছে, ১৬ বছর বয়সীদের ভোটাধিকার চালু করেছে, পাঁচ লক্ষেরও বেশি শিশুকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে, গ্রেট বৃটিশ এনার্জি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে।
এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, লেবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের সব মানুষ এবং প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করার লক্ষ্যে নতুন করে মনোযোগী হবে। সামনে আমাদের সবচেয়ে বড় লড়াই হলো চরম ডানপন্থী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলোর ছড়িয়ে দেয়া বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে। আমাদের দেশের প্রতিটি সম্প্রদায় এবং প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে, যাতে আমরা তাদের জন্য কাজ করতে পারি এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে সেই হুমকিকে পরাজিত করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে স্কাই নিউজকে রুপা হক বলেন, কিয়ের স্টারমারের সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, স্থানীয় নির্বাচনে ভয়াবহ ফলাফলের পর তার নিজ দলের এমপিদের মধ্যে তার বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল থাকা অসম্ভব করে তোলে। রুপা হক আরো বলেন, অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক একটি পদত্যাগের ভাষণ দেন তিনি, যেখানে স্টারমার সবসময় দেশের স্বার্থকেই সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার পর টিউলিপ সিদ্দিক এমপি এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, কী অসাধারণ এক উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছ, আমার বন্ধু! আমাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনি জিবি এনার্জি, রেলপথকে পুনরায় সরকারি মালিকানায় আনা, পানি খাতের নিয়ন্ত্রণ, ভাড়াটিয়াদের অধিকার, শ্রমিকদের অধিকার, পরিকল্পনা সংস্কার, আবাসসেবা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, পুলিশিং ও অপরাধ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং স্কুল ও শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করেছেন। ১৪ বছর পর লেবার পার্টিকে আবার সরকারে ফিরিয়ে আনা কোনো ছোট অর্জন ছিল না।
২০১৪ সালে ব্রান্সউইক সেন্টারে পরিকল্পনা করার দিনগুলো থেকে, ২০১৫ সালে ক্যামডেনে জয়লাভ, ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে লড়াই, বিরোধী দলে কঠিন সময়ে আমাদের দলকে পুনর্গঠন করা এবং ২০২০ সালে আমাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা- সবকিছুই এই পথচলার অংশ। আপনার নেতৃত্বে আমি বিরোধী দলে থাকাকালীন ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস রিভিউ লিখেছিলাম, যা সিটি অব লন্ডনের জন্য আমাদের নীতিগত রূপরেখা নির্ধারণ করেছিল। আপনারা অধীনে ইকোনমিক সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার সুযোগ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান। আর গত দুই বছরে আপনার ও ভিকের অবিচল সমর্থন আমি কোনোদিন ভুলব না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আজও আগের মতোই রয়ে গেছে- একটি লেবার সরকার, যা আমাদের দেশের মানুষের জীবনকে আরও ভালো করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগ প্রসঙ্গে আফসানা বেগম বিবৃতিতে বলেন, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য মেনে নেয়া কঠিন, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে তিনি ‘রাজনৈতিক, আর্থিক ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া’ একটি লেবার পার্টির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ২০১৯ সালে লেবার পার্টির সদস্যসংখ্যা ছিল পাঁচ লক্ষেরও বেশি। আজ সেই সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বহু সদস্যকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, আর অনেকেই বাধ্য হয়ে দল ছেড়ে চলে গেছেন। রাজনৈতিক ও নৈতিক দিক থেকে কিয়ের স্টারমার নাগরিক স্বাধীনতার ওপর কঠোর হস্তক্ষেপ করেছেন, প্রতিবন্ধী মানুষের ভাতা কমিয়েছেন, গাজায় সংঘটিত গণহত্যায় বৃটেনের সম্পৃক্ততার তত্ত্বাবধান করেছেন এবং অভিবাসন ইস্যুতে ডানপন্থীদের ছাপিয়ে যাওয়ার নীতি অনুসরণ করেছেন। স্টারমার-ম্যাকসুইনি প্রকল্পের একমাত্র কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল- দলের বামপন্থী শক্তিকে প্রান্তিক ও ক্ষমতাহীন করে দেয়া। সরকারে দুই বছর পূর্ণ করার পর কিয়ের স্টারমার বলেছেন, তার সরকারের সবচেয়ে গর্বের অর্জন ছিল দুই-সন্তান সীমা নীতি বাতিল করা। বিষয়টি পরিহাসের, কারণ ২০২৪ সালে আমি এবং অন্যান্য বামপন্থী এমপিরা এই নীতি বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়ার কারণেই দল থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়েছিলাম। পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে এবং দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি করতে হলে লেবার পার্টিকে- সব স্তরেই- সত্যিকার অর্থে বিশ্লেষণ করতে হবে, কোথায় এবং কেন এত বড় ভুল হয়েছে। সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে, পরবর্তী লেবার নেতা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন এবং একই পরিণতির মুখোমুখি হবেন। এর মধ্যে এটিও স্বীকার করতে হবে যে, লেবার পার্টির সবচেয়ে বড় সংকট হলো- আমরা ক্রমাগত আমাদের বামপন্থী সমর্থনভিত্তি হারাচ্ছি। আজ লেবার পার্টি অস্তিত্বগত প্রশ্নের মুখোমুখি। শুধু নেতৃত্বের মুখ বদলালেই হবে না; প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক পুনর্গঠন। এর অর্থ হতে হবে ধারাবাহিক রক্ষণশীলতা, বেসরকারিকরণ এবং অভিবাসীদের অধিকার, ট্রান্স মানুষের অধিকার, প্রতিবাদের অধিকার ও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের ওপর চলমান আক্রমণ থেকে একটি স্পষ্ট আদর্শিক বিচ্ছেদ। লেবার পার্টির কাছে জনগণ এমন একটি রূপান্তরমূলক রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রত্যাশা করে, যা আমাদের কমিউনিটিগুলোকে ক্ষমতায়ন করবে, জনসেবাকে পুনর্গঠন করবে এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়বে।
এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি, এমন একটি নেতৃত্ব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত, যেখানে সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রার্থীদের আদর্শ, মূল্যবোধ ও নীতিমালা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা যাবে। এই মুহূর্তে তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তাই আমি আমার সহকর্মী এমপিদের প্রতি আহ্বান জানাই- এখন থেকে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এমন একটি লেবার পার্টি গড়ে তুলতে সহায়তা করে, যা ওয়েস্টমিনস্টারের গণ্ডির বাইরে থাকা মানুষের দাবি ও প্রত্যাশার প্রতি সত্যিকার অর্থে জবাবদিহিমূলক।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন