বাংলাদেশ যেন আর্জেন্টিনার ‘হোম গ্রাউন্ড’

বাংলাদেশ যেন আর্জেন্টিনার ‘হোম গ্রাউন্ড’

ফন্ট সাইজ:

ফুটবল মানচিত্রে এক অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প লিখে চলেছে বাংলাদেশ। ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার মাঠের লড়াই যখন চলছিল, তখন বুয়েন্স আয়ার্স থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরে ঢাকার আকাশ-বাতাস কাঁপছিল ‘মেসি মেসি’ স্লোগানে। আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ মিশন শুরু হতেই বাংলাদেশের বাঁধভাঙা উদ্‌যাপনের জোয়ার এবার আছড়ে পড়েছে খোদ ইউরোপিয়ান আর আর্জেন্টাইন মূলধারার সংবাদমাধ্যমে। স্প্যানিশ স্পোর্টস জায়ান্ট ‘মার্কা’ থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনার টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এখন বিস্মিত নয়নে দেখছে এক অবিশ্বাস্য ‘মেসি ম্যানিয়া’।

ক্যাম্পাসে ভোরের গর্জন ও বাঁধভাঙা উল্লাস: ম্যাচটি যখন শুরু হয়, বাংলাদেশে তখন বর্ষার ভেজা সকাল। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৭টা। প্রতিকূল সময় কিংবা বৃষ্টির বাগড়া- কোনো কিছুই দমাতে পারেনি লাল-সবুজের দেশের ফুটবল পাগলদের। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হল মাঠের বিশাল স্ক্রিনের সামনে জড়ো হয় হাজার হাজার শিক্ষার্থী। আর্জেন্টিনার এক-একটা আক্রমণ, ডিফেন্সের প্রতিটি ট্যাকলে মেগা স্ক্রিনের সামনে তৈরি হচ্ছিল এক-একটা সুনামি। লিওনেল মেসি যখন জাদুকরী হ্যাটট্রিকে মাঠ মাতাচ্ছেন, তখন ঢাকায় ড্রামের আওয়াজ আর করতালিতে তৈরি হয় যেন বুয়েন্স আয়ার্সের ‘লা বোম্বোনেরা’ স্টেডিয়ামের আবহ।

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বাঁধভাঙা উল্লাসের ভিডিও ক্লিপগুলো এখন গ্লোবাল মিডিয়ার টাইমলাইনে অন্যতম আলোচনার খোরাক। ইউরোপিয়ান সাংবাদিকরা বলছেন, ফুটবলের প্রতি এমন নিঃশর্ত উন্মাদনা খোদ লাতিন আমেরিকাতেও বিরল।

সংখ্যার সমীকরণ: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘এল পাইস’ এক বিশেষ পরিসংখ্যানে দেখিয়েছে, ১৬ কোটির এই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সক্রিয় সমর্থক কমপক্ষে ৭ কোটি ২০ লাখ, যা খোদ আর্জেন্টিনার মোট জনসংখ্যার (সাড়ে ৪ কোটির কিছু বেশি) চেয়েও অনেক বেশি! এই বিশাল জনগোষ্ঠী আলজেরিয়া ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তকে নিজেদের অস্তিত্বের অংশ বানিয়ে নিয়েছিল।

এই ম্যাচটি শুধু জয়ের জন্য নয়, ইতিহাসের পাতায়ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে মেসি বিশ্বকাপে নিজের মোট গোল সংখ্যা ১৬-তে নিয়ে গেছেন। এটি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের সমান। আর বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মেসির এই বিশ্বরেকর্ড যেন তাদের নিজেদের ঘরের মানুষের সাফল্য।
ফুটবল যখন কূটনৈতিক সেতু: মিডিয়া রিপোর্টে আরও একটি সুন্দর দিক উঠে এসেছে- এই ভালোবাসার প্রতিদান।

বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম আবেগকে সম্মান জানিয়ে ২০২২ বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনা সরকার দীর্ঘ চার দশক পর ঢাকায় তাদের স্থায়ী দূতাবাস পুনরায় চালু করেছে। প্রসঙ্গত, কাতার ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালেই আর্জেন্টিনা ঘোষণা দেয় যে, ঢাকায় আবার দূতাবাস খুলবে দেশটি। দূতাবাদ উদ্বোধনকালে আর্জেন্টিনার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান্তিয়াগো আন্দ্রেস ক্যাফিয়েরো বলেন, ‘আজ এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমি বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষকে অভিনন্দন জানাই। আশা করি, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও আর্জেন্টিনার প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।’

ভোররাতের মোটরসাইকেল র‌্যালি, গায়ে আলবিসেলেস্তে জার্সি জড়ানো রিকশাচালক আর বাড়ির ছাদে উড়ানো বিশাল সব পতাকাই প্রমাণ করে- এই সম্পর্ক শুধু ৯০ মিনিটের খেলার নয়। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে ফুটবল কীভাবে দুটো ভিন্ন সংস্কৃতি ও দেশকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে, বাংলাদেশ আর আর্জেন্টিনার এই ‘মেসি ম্যানিয়া’ তারই এক জীবন্ত দলিল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন