হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধের দাবি ইরানের

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা শুরু হচ্ছে সুইজারল্যান্ডে

হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধের দাবি ইরানের

ফন্ট সাইজ:

যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরানের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেয়ার দাবি করেছে। এ অবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা সুইজারল্যান্ডে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের এ দাবির বিরোধিতা করে বলেছে, জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ইরান জানিয়েছে, লেবাননে ইসরাইলের প্রাণঘাতী হামলার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হয়েছে। তেহরানের দাবি, এসব হামলা যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তির লঙ্ঘন।

শনিবার দিবাগত গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটন ত্যাগ করে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেন। সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা। ইতিমধ্যে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে। এতে রয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

নতুন দফার আলোচনা রোববার শুরু হওয়ার কথা। জেডি ভ্যান্স বলেন, তিনি পারমাণবিক ইস্যু এবং লেবাননের যুদ্ধবিরতি বিষয়ক ইস্যুতে অগ্রগতির আশা করছেন। বিমানযাত্রার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তাকে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সেখানে পরিস্থিতি আসলে উন্নতির দিকে যাচ্ছে এবং সংঘাত কিছুটা ধীর হয়ে এসেছে। তিনি আরও বলেন, এটি এমন একটি বিষয়, যা আমাদের ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে ইসরাইল ও লেবানন উভয়ই নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে পুরো অঞ্চলকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল করা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, তার দেশ অপর পক্ষকে তাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে বাধ্য করার দাবি জানাবে। বিবিসিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আলোচনার উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত থাকবেন। পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার একটি পর্বও আয়োজন করেছিল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন, যাতে লেবাননের সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা। চুক্তিতে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে আরও আলোচনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর চলমান সংঘর্ষ। ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরগুলোতে অবস্থান করছে।

শনিবার লেবাননে একাধিক ইসরাইলি বিমান হামলায় কমপক্ষে ৪৭ জন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং সংগঠনটির ডজনখানেক সদস্যকে হত্যা করেছে। আইডিএফ আরও জানিয়েছে, তাদের চারজন সেনাও নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি ঘোষণার পরও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে শুক্রবার বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

চুক্তির আগে ইসরাইল জানায়, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা করছে না এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতকে তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে পৃথক হিসেবে দেখছে। হিজবুল্লাহ বলেছে, লেবাননে ইসরাইলি হামলা বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে ধ্বংস করার চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্র সরকার লেবাননে ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযানকে সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা শুরু করলে লেবানন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২রা মার্চ থেকে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, লেবাননে ইসরাইলের হামলা যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘন। তাদের দাবি, যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পর পুনরায় খুলে দেয়া হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করা হয়েছে।
প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে ইরানের সামরিক বাহিনী অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারা বাস্তবায়ন না করে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। ওই ধারায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা ছিল। তবে ইরানের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে এই অবস্থা বজায় থাকে। তিনি আরও যোগ করেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে নয়। সেন্টকম জানিয়েছে, শনিবার ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এগুলোতে বিশ্ববাজারের জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বহন করা হচ্ছিল।

বিবিসি ভেরিফাই পর্যবেক্ষণ করা জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার কমপক্ষে পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে কয়েকটি জাহাজকে ওই এলাকায় ঘুরে যেতে দেখা গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দেয়, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের উপযোগী গভীরতা রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলো এবং তাদের ক্রেতারা এই পথ ব্যবহার করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে। বছরে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন