দুই যুগের অপেক্ষার অবসান, তবু কী যেন নেই ব্রাজিলে

দুই যুগের অপেক্ষার অবসান, তবু কী যেন নেই ব্রাজিলে

ফন্ট সাইজ:

মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের ম্যাড়মেড়ে ড্রয়ের ধাক্কা সামলে দ্বিতীয় ম্যাচেই জয় তুলে নিলো ব্রাজিল। ফিলাডেলফিয়ার লিঙ্কন ফিনান্সিয়াল ফিল্ডে গ্রুপ ‘সি’-এর ম্যাচে লড়াকু তবে তুলনামূলক ছোট প্রতিপক্ষ হাইতিকে ৩-০ ব্যবধানে হারালো কার্লো আনচেলোত্তির দল। প্রথমার্ধের ঝোড়ো আক্রমণেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলে সেলেসাওরা। ২০০২ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে ম্যাচের প্রথমার্ধেই তিন গোল করে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে পূর্ণ তিন পয়েন্ট পেলেও অতীতের সেই চেনা ছন্দ বা সাম্বা ফুটবলের চিরাচরিত আক্রমণাত্মক ধার থেকে এখনো বেশ দূরে ব্রাজিল।

ফলে দলটির বিশ্বকাপ অভিযান নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের মনে কিছুটা সংশয় থাকছেই। পুরো ম্যাচে ৫৭ শতাংশ সময় বল নিয়ন্ত্রণে রেখে মোট ৮টি শট নেয় ব্রাজিল, যার মধ্যে বড় সুযোগ ছিল ৪টি। বিপরীতে ৪৩ শতাংশ বল দখল রাখা হাইতি ৭টি শট নিলেও, তাদের তৈরি করা এক্সপেক্টেড গোলস ছিল মাত্র ০.২৩। ম্যাচের শুরু থেকেই উইংয়ের গতি ব্যবহার করে হাইতির ‘লো ব্লক’ রক্ষণভাগকে ভেঙে চুরমার করে দেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনহা। দ্বাদশ মিনিটে রাফিনহার একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও, ২৩ মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পায় ব্রাজিল। ভিনির জোরালো শট হাইতি গোলকিপার প্লাসাইড ফিরিয়ে দিলে ফিরতি বলে পা ছোঁয়ান মাথেউস কুনিয়া। বলটি ডেলক্রোয়ার গায়ে লেগে জালে জড়ালেও, শেষ পর্যন্ত কুনহার পায়ে ডিফ্লেক্টেড হওয়ায় তার নামে গোলটি নথিভুক্ত হয়। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলের পর আবেগাপ্লুত কুনহা বলেন, ‘বিশ্বকাপে থাকার কথা কল্পনা করাটাও দারুণ চমৎকার ব্যাপার। এটা আমার একটা স্বপ্ন পূরণ।’ প্রথম গোলের ঠিক ১০ মিনিট পর আবারো ভিনির পাস থেকে বক্সে চমৎকার কোনাকুনি দৌড় দিয়ে নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন কুনহা।

প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে (৪৫+৩ মিনিট) লুকাস পাকেতার রক্ষণভেদ করা পাস থেকে ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন ৩-০ করেন ভিনি। ২০০২ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধেই ৩ গোল দেয়ার কৃতিত্ব দেখালো ব্রাজিল। তবে এই স্বস্তির মাঝেই বড় ধাক্কা হয়ে আসে রাফিনহার হ্যামস্ট্রিং চোট। ফলে টুর্নামেন্টের পরের ম্যাচগুলোতে ব্রাজিলের ট্যাকটিক্যাল প্ল্যানে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তার বদলে মাঠে নামেন ১৯ বছর বয়সী রায়ান। ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি দলের এই পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করার পাশাপাশি বেশ কিছু ট্যাকটিক্যাল ব্যাখ্যা দেন। বিশেষ করে ইগর থিয়াগোর বদলে কুনহাকে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এই ম্যাচের জন্য মাথেউস কুনহারর পজিশনিং হাইতির ডিফেন্সের সমস্যা তৈরি করতে খুব কার্যকর ছিল। সে খুব ভালোভাবে পাস ফিল্টার করেছে এবং পজিশন নিয়েছে।

সে আমাদের জন্য ভালো একটা অপশন হতে পারে। তবে আমি কোনো নির্দিষ্ট ছক বা পরিচয় তৈরি করতে চাই না, কারণ আগামী ম্যাচেই আমরা কৌশল বদলে ফেলতে পারি।’ ভিনিসিয়ুসের চমৎকার ফর্ম ও ট্যাকটিক্যাল পজিশন নিয়ে আনচেলোত্তি আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা ভিনিসিয়ুসকে উইং থেকে একটু ভেতরের দিকে খেলিয়েছি এবং উইংয়ের ফাঁকা জায়গা ভরাট করার দায়িত্ব দিয়েছিলাম ডগলাস সান্তোসকে। সে খুব ভালো করেছে। ভিনিসিয়ুস কেবল ওয়ান-অন-ওয়ান পজিশনেই বিপজ্জনক নয়, বরং সেন্ট্রাল এরিয়া দিয়ে ডিফেন্সের পেছন থেকে আক্রমণ চালাতেও সমান পারদর্শী।’ কোচ সাফ জানিয়ে দিলেন, তারা এটিকে কেবল ‘ভিনিসিয়ুসের বিশ্বকাপ’ হিসেবে দেখছেন না, বরং এটি হতে যাচ্ছে পুরো ‘ব্রাজিলের বিশ্বকাপ’। প্রথমার্ধের সেই কার্যকারিতা দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের খেলায় একদমই দেখা যায়নি। আনচেলোত্তির দল গোলসংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে শক্তি জমিয়ে রাখা এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। ৫৭তম মিনিটে ভিনিসিয়ুস ব্যবধান ৪-০ করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন।

শেষ মুহূর্তে হাইতির সিমনের এক দূরপাল্লার জোরালো শট চমৎকার ‘হলিউড সেভ’-এ রুখে দিয়ে ব্রাজিলের ক্লিনশিট ধরে রাখেন অ্যালিসন বেকার। দ্বিতীয়ার্ধের এই অলস ফুটবল নিয়ে আনচেলোত্তি অবশ্য পারফরম্যান্সের ঘাটতির চেয়ে ট্যাকটিক্যাল নিয়ন্ত্রণের কথাই বলেছেন। এই জয়ে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ মিশন গতি পেলেও, গ্রুপ ‘সি’র শীর্ষস্থান নির্ধারণে শেষ পর্যন্ত মরক্কোর সঙ্গে গোল ব্যবধানের হিসাব আসতে পারে। তেমন কিছু হলে দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের এই ঢিলেঢালা মনোভাব তাদের বিপদ ডেকে আনতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন