জাফলংয়ে পাথর লুট করছে কারা?

জাফলংয়ে পাথর লুট করছে কারা?

ফন্ট সাইজ:

জাফলং জুড়ে পাথর লুট হচ্ছে। এর প্রমাণ দিলো গোয়াইনঘাটের প্রশাসনও। গতকাল টানা কয়েক ঘণ্টার অভিযানে দেখা মিলেছে জাফলং লুটের ছিন্ন-ভিন্ন দৃশ্য। কখন জাফলং বেশি লুট হয়েছে- প্রশ্নের জবাবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনের ব্যস্ততার সুযোগে অন্তত ৫০ কোটি টাকার বালু ও পাথর লুট হয়েছে।

এ সময় কোয়ারিতে নামানো হয়েছে যন্ত্রদানব বোমা মেশিনও। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ট্রল হলেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম সহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জাফলং নিয়ে নীরবই থেকেছেন। গতকাল যখন জাফলংয়ে প্রশাসন অভিযান চালায়- তখন দেখা যায় রীতিমতো কোয়ারি বড় বড় গর্ত খুঁড়ে জাফলং লুট করা হচ্ছে। জুমপাড় এলাকাকে পরিণত করা হয়েছে লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে।

নদীতে বসানো হয়েছে ২০ থেকে ২৫টি বোমা মেশিন। এই মেশিনের তাণ্ডব এতটাই বেশি যে, গোটা কোয়ারির তলদেশ পাথরশূন্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে জাফলংয়ে চোখ দিতে পারেনি প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তারা নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর এই সুযোগে জাফলংয়ের চিহ্নিত পাথর লুটেরা যন্ত্রদানব বোমা মেশিন লাগিয়ে পাথর লুট করেছে। এই লুটের নেতৃত্ব দিয়েছে পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি হেলাল আহমদ ও স্থানীয় পাথরখেকো জিয়াউর রহমান সাবু। তাদের নেতৃত্বে বোমা ও বিলাই মেশিন বসানো হয়। আর প্রতি বোমা মেশিন থেকে পুলিশের নামে ৫ হাজার টাকা ও বিলাই মেশিন থেকে ২ হাজার টাকা আদায় করা হয়।

জাফলংয়ের লাখেরপাড়, জুমপাড় এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অনেকেই বিষয়টি ইউএনও ও ওসি’র নজরে এনেছিলেন। তখন নির্বাচনের দোহাই দিয়ে তারা পাত্তাই দেননি। আর এই সুযোগে জাফলং থেকে অন্তত ৫০ কোটি টাকার বালু ও পাথর লুটপাট করা হয়েছে। প্রকাশ্যেই এসব পাথর লুট করা হয়। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত লুটপাট চালিয়ে পাথর সংগ্রহ করা হচ্ছে। আর দিনে চলে পাথর বিক্রি।

অন্যদিকে ‘ডেভিল’ সমেদের নেতৃত্বে জাফলং জুমপাড় এলাকা লুটপাট করা হয়েছে। নয়াবস্তির বাসিন্দা সমেদ আহমদ হচ্ছে ট্রাক-শ্রমিক ইউনিয়নের জাফলংয়ের সভাপতি। তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি সময়ে পরিবেশ, প্রশাসনের একাধিক মামলা হয়েছে। মাথার ওপর ঝুলছে গ্রেপ্তারি হুলিয়াও। কিন্তু ট্রাক-শ্রমিকের সভাপতি হওয়ার কারণে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে না। আওয়ামী লীগের সরকারের সময় সমেদ তৎকালীন সংসদ ও মন্ত্রী ইমরান আহমদের খুব কাছের জন ছিলেন। এমনকি সমেদ ওই সময় নৌকার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায়ও অংশ নেয়।

বিএনপি’র মঞ্চ ভাঙার ঘটনারও নায়ক ছিল সে। সম্প্রতি সময়ে যখন সে ধানের শীষের প্রচারণায় অ্যাক্টিভ হয়েছিল, তখন তাকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয় জাফলংয়ে। তার দ্বিমুখী নীতি নিয়ে ভার্চ্যুয়াল মিডিয়ায় তোলপাড় হয়। সেই সমেদের নেতৃত্বে এবার জাফলংয়ের জুমপাড় এলাকা লুট করা হয়েছে। সঙ্গে ছিল শ্রমিক নেতা ইয়াছিন আহমদ ও সোহাগ আহমদ। তারাও এস্কেভেটর দিয়ে জুমপাড় থেকেই ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার বালু ও পাথর লুট করেছে। তাদের তাণ্ডবে জুমপাড়ের বসতি, পান বাগান ও মন্দির এলাকা ভেঙে গেছে।

এই লুটপাটের বড় অংশ জাফলং বিটে অতীতে কাজ করা কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার পকেটে গেছে। এদিকে, গত শনিবার রাত থেকে গোয়াইনঘাটে এসিল্যান্ড ওমর ফারুক ও ওসি মনিরুজ্জামান অভিযান শুরু করেন। এই অভিযান চলে গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত। এ সময় জাফলং লুটে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে ৯ জনকে আটক করা হলেও মূলহোতাদের ধারে-কাছেও ছিল না প্রশাসন।

অভিযানের সময় মূলহোতারা এলাকায় থাকলেও তাদের আটকের চেষ্টা করেননি অভিযানে থাকা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বরং তাদের অভিযানের স্টিম রোলার গেছে খেটে খাওয়া মানুষের দিকেই। যারা জাফলং নিয়ন্ত্রণ করছে, লুট করছে- প্রশাসন তাদের আটকের চেষ্টা করেনি। তবে লুটের চিহ্নের তরতাজা প্রমাণ মিলে অভিযানে। কয়েকটি বোমা মেশিনও উদ্ধার করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ সময় কয়েক হাজার ফুট পাথর ও বালু জব্দ করা হয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন