নিপুণ কারুকাজ। এ হাত গলিয়ে ও হাত। এক একটি হাত যেন এক একটি মেশিন। এ টেবিল থেকে ও টেবিল হয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করার প্রাণপণ চেষ্টায় সদা নিবেদিত গাঁও গ্রামের শত শত নারী। অজপাড়াগাঁয়ে তাদের হাতে তৈরি জুতা আজ বিশ্ব দরবারে জায়গা করে নিয়েছে সুনামের সঙ্গে। নীলফামারী জেলার শিল্পখ্যাত সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়ন সংলগ্ন রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামে গড়ে ওঠা শতভাগ রপ্তানিমুখী জুতা কারখানা ‘ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড’। বিশাল এক কর্মযজ্ঞ এখানে। চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতে চাইবে না, জুতা তৈরির প্রথম ধাপ থেকে প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ধাপে গ্রামীণ নারীদের কি দারুণ কর্মদক্ষতা। চোখ জুড়ানো নিপুণ কারুকাজ। কেউবা জুতা সেলাইয়ের কাজ করছেন, কেউবা জুতার ফিতা লাগাচ্ছেন, কেউবা প্যাকেজিং এর কাজ নিয়ে মহাব্যস্ত। কারোই যেন চোখ তুলে তাকানোর ফুসরত নেই।
২০১৭ সালের গোড়ার দিকে নীলফামারী শহরের বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা আমেরিকা প্রবাসী দুই ভাই মো. সেলিম মো. হাসানুজ্জামান তারাগঞ্জ উপজেলার অজপাড়াগাঁ ঘনিরামপুর গ্রামে জুতা কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। একইসঙ্গে অবহেলিত এ জনপদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার মানসে প্রায় ১০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠা করেন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস কোম্পানি। অবহেলিত এ অঞ্চলে জুতা তৈরির কারখানা যেন আশীর্বাদ হয়ে আসে কর্মহীন নারী-পুরুষের মাঝে। রংপুর-দিনাজপুর প্রধান সড়কের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ব্লিং লেদার কোম্পানি একটি রপ্তানিমুখী জুতা তৈরির কারখানা। সরজমিন দেখা গেছে, বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা কোম্পানিটি বেশ পরিপাটি, সাজানো-গোছানো। মজার বিষয় হলো এখানে কর্মরতদের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মীই নারী। যাদের বেশির ভাগেরই বাড়ি আশপাশের গ্রামগুলোতে। আদুরি নামের এক কর্মী জানান, জুতা কোম্পানিটি তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। কথা হয় সেলিনা বেগম নামের অপর এক নারী কর্মীর সঙ্গে। তিনি কোম্পানির লাস্টিং বিভাগে কাজ করেন। তার অভিমত আরও শক্ত।
ঘনিরামপুর একটি অবহেলিত গ্রাম। এ এলাকার মানুষ কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি এ গাঁয়ে কারখানা তৈরি হবে। তাদের ছেলেমেয়েরা কোম্পানিতে চাকরি করবেন। এটা ছিল চিন্তারও বাইরে। অথচ এই কোম্পানির বদৌলতে এখানকার পরিবেশ বদলে গেছে। রাস্তাঘাট হয়েছে। গড়ে উঠছে অনেক ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, বাসাবাড়ি। সাথী নামের আরেক নারী কর্মী বলেন, এখানে কাজের পরিবেশ ও পারিশ্রমিক দুটোই সন্তোষজনক। যাদের সংসারে এক সময় নুন আনতে পান্তা ফুরাতো, তারা আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। আর এ সমস্ত অবহেলিত পরিবারের সদস্যদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের জুতা। যা রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে। কোম্পানির এমডি মো. হাসানুজ্জামান বলেন, নীলফামারী সদর ও রংপুরের মিঠাপুকুরে প্রায় ১০ লাখ বস্তা ধারণ ক্ষমতার দুটি হিমাগার স্থাপনের পর তারাগঞ্জের ঘনিরামপুরে জুতা তৈরির কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেন তারা। তিনি বলেন, তার বড় ভাই মরহুম মো. সেলিমের লালিত স্বপ্নের ফসল আজকের এ জুতা কোম্পানি। অবহেলিত এ এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন বিশেষ করে এলাকার পিছিয়ে পড়া নারীদের কর্মস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটিতে এরইমধ্যে প্রায় ৩ হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।
তিনি বলেন, কোম্পানিতে এরই মধ্যে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি লগ্নি করা হয়েছে। এখানে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার জোড়া জুতা তৈরি হচ্ছে। হাসানুজ্জামান জানান, এখানে দুটি ইউনিটে পুরোদমে সিনথেটিক জুতা উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হচ্ছে। অচিরেই আরও একটি ইউনিট চালু হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এখানে কর্মরত কর্মীদের শুরু থেকেই ন্যূনতম মজুরিকাঠামো মেনেই বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন, নারী কর্মীদের জন্য রয়েছে মাতৃকালীন ছুটি ও চিকিৎসা সহায়তা। নতুন কর্মীদের নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণকালীন ভাতা প্রদান করা হয়। ২০২৪ সালে রুপালী ব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি লাভ করা এ কোম্পানিটির উৎপাদিত জুতা বর্তমানে পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
