রোহিঙ্গা ক্যাম্প এখন ইয়াবা কারবারের কেন্দ্র

ফন্ট সাইজ:

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে মাদকের অন্ধকার সাম্রাজ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য, বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান দেশে প্রবেশের পর তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ক্যাম্পগুলো শুধু মানবিক সংকটের কেন্দ্র নয়, বরং মাদক কারবারিদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিত্তে ও সীমান্তবর্তী মংডু এলাকা থেকে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের চালান নাফ নদ, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি পথ এবং সাগর পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

এসব চালানের একটি অংশ টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ক্যাম্পভিত্তিক বিভিন্ন সশস্ত্র ও অপরাধী গোষ্ঠীর মধ্যে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে। মাদকের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই খুন, অপহরণ, গুম ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটছে। গত এক বছরে মাদক ব্যবসার প্রভাব বিস্তার নিয়ে সংঘাতে অন্তত ৩০ জন নিহত এবং শতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একইসময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক মাদক মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ২০০ জনকে। গত সাত বছরে দায়ের হওয়া মাদক মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ২০০। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়ের করা মামলার সংখ্যা মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৪০টি।

এসব মামলায় আসামির সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৯০০ জন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই বাহক ও খুচরা কারবারিরা ধরা পড়লেও মূলহোতাদের অনেকেই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় মাদক কারবারের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের সচেতন মহল বলছে, গত কয়েক বছরে সীমান্ত এলাকায় কিছু ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। যাদের অনেকের অতীত আর্থিক অবস্থা ছিল নিতান্তই সাধারণ। হঠাৎ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার পেছনে মাদক ব্যবসার অর্থ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে মাদক কারবারে জড়িতদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে সমন্বিত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে মাদক পাচার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

বাহক নয়, মাদকের মূল হোতা ও অর্থদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। মাদক কারবারে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি ক্যাম্পভিত্তিক অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একইসঙ্গে মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস, সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন