ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। এই অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ এখন নতুন নির্বাচিত সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এটি জনস্বাস্থ্যের প্রতি নতুন সরকারের অবস্থান প্রমাণের একটি অন্যতম সুযোগ। এটি নির্দিষ্ট কোনো দলীয় বিষয় নয়; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরি বিষয়।
বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার বেশ উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৯২ লাখেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (১৫ বছর বা বেশি) তামাক ব্যবহার করে। তার মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে। প্রতিদিনের হিসাবে যা প্রায় ৫৪৬ জন। অন্যদিকে তামাক ব্যবহারজনিত কারণে প্রতিবছর অর্থনৈতিক ব্যায় হয় প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের দ্বিগুণেরও বেশি। তামাকের এই সর্বগ্রাসী আগ্রাসনকে তাই মহামারী হিসেবেই গণ্য করা যায়।
এসডিজি ৩.৪ অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগে অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর অঙ্গীকার করেছে। লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালে এই মৃত্যুহার প্রায় ‘৬‘-এ নামিয়ে আনার কথা। কিন্তু এসডিজি ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মৃত্যুহার ছিলো ১৯, যা ২০২৩ সালে বেড়ে প্রায় ২৪-এর কাছাকাছি হয়ে গেছে (ঝউএ ঞৎধপশবৎ, ঈযরবভ অফারংড়ৎ ঙভভরপব, এড়ই)। অর্থাৎ, বর্তমান গতিতে চললে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, এসডিজির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কোনো বিকল্প নেই।
এই প্রেক্ষাপটে অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদিত অধ্যাদেশে ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টস—এর ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করা হয়েছে; ‘তামাকজাত দ্রব্য’-এর সংজ্ঞার আওতায় নিকোটিন পাউচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপানের পাশাপাশি সকল প্রকার তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান রাখার বিধান সরকারের নির্দেশনার শর্তাধীন করা হয়েছে; ‘পাবলিক প্লেস’ ও ‘পাবলিক পরিবহণ’-এর সংজ্ঞা ও অধিক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হয়েছে; বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শনসহ ইন্টারনেট বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের সকল প্রকার বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রসার নিষিদ্ধ করা হয়েছে; এবং তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের গায়ে বিদ্যমান ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ৭৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সতর্কবাণী মুদ্রণের বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণের এই সংস্কার একদিনে আসেনি। ২০২১ সাল থেকে এটি বিস্তৃত জনপরামর্শ, কারিগরি পর্যালোচনা ও আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদিত ও গেজেটভুক্ত এই অধ্যাদেশটি জনস্বাস্থ্য—বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের স্বাস্থ্য—সুরক্ষায় দীর্ঘদিনের নীতিগত প্রচেষ্টার ফল। তবে এই ঐতিহাসিক অর্জন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। অধ্যাদেশ হিসেবে এটি প্রথম সংসদ অধিবেশনের পর সংবিধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে উপস্থাপন ও আইনে রূপ দিতে হবে। না দিতে পারলে অধ্যাদেশটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অধ্যাদেশটি পাস করে আইনে রূপান্তর করা জরুরি।
অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। ২০১৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনের পর তামাক কোম্পানিগুলো মামলা ও বিলম্ব কৌশলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন ব্যাহত করেছিল। এবারো তেমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। গ্লোবাল টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রি ইন্টারফিয়ারেন্স ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশ শিল্প হস্তক্ষেপে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই সূচকে ১০০-এর মধ্যে ৬৯ স্কোর নিয়ে বিশ্বের মোট ১০০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৬তম। এটি সাম্প্রতিক সংশোধনী প্রক্রিয়ায় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানির স্পষ্ট প্রভাব নির্দেশ করে।
এই প্রেক্ষাপটে, নবনির্বাচিত সংসদকে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা দিতে হবে। তামাক কোম্পানির বহুমাত্রিক চাপে নিজেদের অবস্থান নড়বড়ে করে তোলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের সক্রিয় সম্পৃক্ততা এই বিষয়টি সংসদের এজেন্ডায় ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও চূড়ান্ত দায়িত্ব আইনপ্রণেতাদেরই।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুমোদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বিশ্বে অন্যতম শক্তিশালী আইনে পরিণত হয়েছে। এখন জরুরি হলো এই অধ্যাদেশকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর করা এবং নবনির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। সংসদের দৃঢ় ও দায়িত্বশীল অবস্থানই পারে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমাতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি তামাকমুক্ত, সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কাছে আমাদের এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: সাবেক পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
