কবি আল মুজাহিদী আর নেই

কবি আল মুজাহিদী আর নেই

ফন্ট সাইজ:

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক আল মুজাহিদী মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শুক্রবার দুপুরে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কবির মৃত্যু হয় বলে তার ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী জানান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
আল মুজাহিদী ছিলেন একধারে কবি, গবেষক ও সম্পাদক। গত শতকের ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি বিবেচিত।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী পলিন পারভীন, ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী, মেয়ে মারিয়ামা জাবীন আল মুজাহিদী, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানাজার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কবিকে আজ মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে দাফনের বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।
১৯৪৩ সালের ১লা জানুয়ারি টাঙ্গাইলের গোপালপুরের নারুচি গ্রামে আল মুজাহিদীর জন্ম। তার বাবা আবদুল হালিম জামালী ছিলেন একজন নাট্যকার ও সংগঠক। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেন। আর মা সাখিনা খান ছিলেন গীত-রচয়িতা এবং সমাজকর্মী।

১৯৬০ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন আল মুজাহিদী। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি দু’বার স্নাতকোত্তর করেন।
বাবার নাট্যচর্চা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তার রাজনৈতিক দর্শন আল মুজাহিদীকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তাকেও বেশ কয়েকবার কারাগারে যেতে হয়। একাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

নিজের কাব্যশৈলীতে তিনি ষাটের দশকের আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। মৃত্তিকার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতি, প্রেম, জাতীয় চেতনা এবং আত্মদর্শন তার কাব্যজগতের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সমাজবিজ্ঞানে ভালো দখল থাকায় নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহ্যিক উপাদানকে তিনি অবলীলায় নিজের কাব্যছন্দে আত্মীকরণ করে নেন।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন আল মুজাহিদী। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। হেমলকের পেয়ালা, ধ্রুপদ ও টেরাকোটা, দূত পারাবত, মৃত্তিকা অতি-মৃত্তিকা, সমুদ্র মেখলা, কালের বন্দিশে, কাঁদো হিরোশিমা, কাঁদো নাগাসাকি, যুদ্ধ নাস্তি, ঈডের হ্যামলেট, সহস্র দিবস সহস্র রজনী, প্রাচ্য পৃথিবী, পৃথিবীর ধুলো, সৌর জোনাকি, ভিতা নুওভা, অ্যাকাডেমাসের বাগান, সন্ধ্যার বৃষ্টি তার অন্যতম কাব্যগ্রন্থ। তার লেখা উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে মানব বসতি, সনেট, আর্কিওপটেরিক্স, মিলু এট ও স্যোন্যাটা এবং লালবাতির হরিণ।

প্রপঞ্চের পাখি, বাতাবরণ ও ভরা কটাল মরা কটালের চাঁদ তার গল্পগ্রন্থ। রাজ করোটি ও মেরুমৈত্রী তার প্রবন্ধ সংকলন। কাইফি আজমির কবিতা, পৃথিবীর কবিতা, আহমদ ফরাজের কবিতা, উর্দু কবিতা, হিন্দি কবিতা ও হাইনরীশ হাইনের কবিতা তার অনুবাদগ্রন্থ।
পেশাজীবনে তিন দশকের বেশি সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন আল মুজাহিদী। ২০১২ সালে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন যায়যায়দিন পত্রিকায়। সবশেষ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ষাণ্মাষিক সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এ ছাড়া ‘জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার’, ‘কবি জসীমউদ্‌দীন একাডেমি পুরস্কার’, ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার লাভ করেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন