অস্তিত্বের সংকটে বিশ্বের অর্ধেক ভাষা: বিপন্ন মাতৃভাষার মানচিত্র ও পরিসংখ্যান

অস্তিত্বের সংকটে বিশ্বের অর্ধেক ভাষা: বিপন্ন মাতৃভাষার মানচিত্র ও পরিসংখ্যান

ফন্ট সাইজ:

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পেরিয়ে গেলেও বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার ভাঁজ বিশেষজ্ঞদের কপালে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের মোট ভাষার প্রায় অর্ধেকই এখন বিলুপ্তির পথে। মান্দারিন, ইংরেজি বা স্প্যানিশের মতো প্রভাবশালী ভাষাগুলোর দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব কথ্য ও লেখ্য রূপ।

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৭ হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে এবং এর মধ্যে অন্তত ৩ হাজার ভাষা বা প্রায় ৪০ শতাংশই এখন বিপন্ন।

বিশ্বের ভাষাগুলোর তথ্যভাণ্ডার ‘ইথনোলগ’-এর মতে, ইংরেজি বিশ্বের সবচেয়ে বহুল প্রচলিত ভাষা। ১৮৬টি দেশে প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। তবে প্রতি ১০ জন ইংরেজি ভাষাভাষীর মধ্যে মাত্র ২ জন এটি মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষের কাছে ইংরেজি তাদের দ্বিতীয়, তৃতীয় বা উচ্চতর ভাষা।
মান্দারিন চাইনিজ প্রায় ১২০ কোটি ব্যবহারকারী নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে চীনর বিশাল জনসংখ্যার কারণে মাতৃভাষার নিরিখে এটিই বিশ্বের বৃহত্তম ভাষা।

ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিচারে ৬০ কোটি ৯০ লাখ নিয়ে হিন্দি রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। এরপর রয়েছে স্প্যানিশ (৫৫ কোটি ৯০ লাখ) এবং স্ট্যান্ডার্ড অ্যারাবিক (৩৩ কোটি ৫০ লাখ)।
ইথনোলগ এবং ইউনেস্কোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে প্রচলিত ৭ হাজার ১৫৯টি ভাষার মধ্যে ৩ হাজার ১৯৩টি (৪৪ শতাংশ) ভাষাই বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে, মাত্র ৭ শতাংশ বা ৪৮৭টি ভাষা ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ মর্যাদা পেয়েছে। যা সরকারি কাজ, শিক্ষা ও গণমাধ্যমে ব্যবহৃত হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, বিপন্ন ভাষার মধ্যে ১ হাজার ৪৩১টি ভাষায় কথা বলার মতো মানুষ ১ হাজার জনেরও কম। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, অন্তত ১১০টি ভাষা এমন পর্যায়ে আছে যেখানে কথা বলার মতো মানুষ ১০ জনের বেশি নেই।
বিশ্বের বিপন্ন ভাষাগুলোর ৮০ শতাংশই মাত্র ২৫টি দেশে সীমাবদ্ধ। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বিপন্ন ভাষার ক্রমতালিকায় শীর্ষে রয়েছে ওশেনিয়া অঞ্চল। এরপর যথাক্রমে এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার অবস্থান।

ওশেনিয়া: অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ভাষা ‘ইউগাম্বেহ’ এখন খাদের কিনারায়। তবে আধুনিক অ্যাপ ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে এটি বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।

এশিয়া: জাপানের ‘আইনু’ ভাষাটি এখন অতি-বিপন্ন। এক জরিপ মতে, প্রায় ২৪ হাজার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ৩০৪ জন এই ভাষাটি জানেন।

আফ্রিকা: ইথিওপিয়ার ‘ওঙ্গোটা’ ভাষাটি এখন মাত্র কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের স্মৃতিতে টিকে আছে।

ইউরোপ ও আমেরিকা: উত্তর ও মধ্য আমেরিকার প্রায় সব আদিবাসী ভাষা সংকটে। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে ইংল্যান্ডের ‘কর্নিশ’ ভাষা। বিলুপ্ত ঘোষণা করার পরও নিবিড় প্রচেষ্টায় ২০১০ সালে এটি পুনরায় জীবিত ভাষার তালিকায় ফিরে এসেছে।

কেন ভাষা বিপন্ন হচ্ছে?
গবেষকদের মতে, একটি ভাষা তখনই বিপন্ন হয় যখন সেই গোষ্ঠীর মানুষ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজের ভাষার বদলে অন্য কোনো প্রভাবশালী ভাষা (যেমন- ইংরেজি বা ম্যান্ডারিন) হস্তান্তর শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বে লাতিন লিপির আধিপত্য সবচেয়ে বেশি, বিশ্বের ৭০ শতাংশ মানুষ এই লিপি ব্যবহার করে।

সুপ্ত বনাম বিলুপ্ত ভাষা
বর্তমানে পৃথিবীতে ৩৩৭টি ভাষাকে ‘সুপ্ত’ বলা হয়। এর অর্থ হলো, এই ভাষায় সাবলীল কথা বলার মতো কেউ বেঁচে নেই, তবে জাতিগত পরিচয়ের অংশ হিসেবে কিছু সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার আছে। অন্যদিকে, ৪৫৪টি ভাষা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যাদের কোনো ব্যবহারকারী বা উত্তরাধিকারী অবশিষ্ট নেই।
মাতৃভাষার এই সংকটে বিশ্বজুড়ে ভাষাবিজ্ঞানীরা দাবি তুলেছেন, কেবল বড় ভাষাগুলোর ওপর গুরুত্ব না দিয়ে আঞ্চলিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাকে ডিজিটালাইজড এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন