শ্রদ্ধা, রাজনীতি ও স্মৃতির রাজপথ

শ্রদ্ধা, রাজনীতি ও স্মৃতির রাজপথ

ফন্ট সাইজ:

রাষ্ট্রের আচার ও শহীদদের প্রতি সম্মান এই দুইয়ের সীমারেখা বাংলাদেশে কখনোই সরল ছিল না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন সেই জটিলতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। ভাষা শহীদদের স্মৃতির বেদিতে ফুল দেওয়ার দৃশ্যটি একদিকে প্রতীকী, অন্যদিকে রাজনৈতিক এ দ্বৈততার কারণেই ঘটনাটি আলোচনার কেন্দ্রে।

ঐতিহাসিকভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল কেবল একটি দিবস নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্মকথার সঙ্গে যুক্ত এক গভীর আবেগের নাম। ভাষা আন্দোলন যে মূল্যবোধের জন্ম দিয়েছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকার তা পরবর্তী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তি গড়ে দেয়। ফলে শহীদ মিনার কোনো দলীয় মঞ্চ নয়; এটি সমষ্টিগত স্মৃতির প্রতীক। এই প্রতীকে কারা, কীভাবে, কোন ভাষায় উপস্থিত হবে সে প্রশ্ন রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠেও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে বিতর্কটি আরও তীব্র। দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে দলটির আমীরকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে দেখা যায়নি এটি কেবল অনুপস্থিতির ইতিহাস নয়, বরং অবস্থানেরও ইঙ্গিত। অতীতে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা বা সহযোগী সংগঠনের কর্মসূচি থাকলেও কেন্দ্রীয় বেদিতে সরাসরি শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল না। সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে এবারের উপস্থিতি তাই প্রশ্ন জাগায় এটি কি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নাকি রাজনৈতিক সময়ের দাবিতে নেওয়া এক কৌশলগত পদক্ষেপ?

রাজনীতিতে প্রতীকী কাজের শক্তি অপরিসীম। বিশেষত গণ-অভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরি হয়েছে, সেখানে গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতার প্রশ্ন সামনে এসেছে। শহীদ মিনারে উপস্থিতি সেই গ্রহণযোগ্যতার অনুসন্ধান হিসেবেও দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিরোধী রাজনীতির নতুন ভাষা নির্মাণের প্রয়াস যেখানে অতীতের দূরত্ব কমিয়ে জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা আছে।

তবে শ্রদ্ধা কি কেবল উপস্থিতিতেই পূর্ণতা পায়? ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়; তাঁদের আদর্শের সঙ্গে নীতিগত সংহতিও জরুরি। ভাষা আন্দোলনের চেতনা বহুত্ববাদ, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারকে ধারণ করে। সেই চেতনার সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না। রাষ্ট্রীয় আচার যখন রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ নেয়, তখন ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাই হয়ে ওঠে মূল মাপকাঠি।

অন্যদিকে, শহীদ মিনার সবার। গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো রাজনৈতিক দলকে স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানানো থেকে বঞ্চিত করার প্রশ্নও ওঠে না। কিন্তু সেই উপস্থিতি যদি অতীতের প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি না হয়, তবে তা সন্দেহের জন্ম দেয়। রাজনীতি বদলায়, অবস্থানও বদলাতে পারে কিন্তু বদলের ব্যাখ্যা ও স্বচ্ছতা না থাকলে প্রতীকী কাজ বিশ্বাস অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।

এই প্রেক্ষাপটে এবারের ঘটনা আমাদের আরেকটি বাস্তবতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, কিন্তু প্রতীকের দায়বদ্ধতা কমছে। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া যেমন অধিকার, তেমনি ভাষা আন্দোলনের আদর্শকে রাজনীতির ভাষায় অনুবাদ করাও দায়িত্ব। শ্রদ্ধা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা আচরণে, নীতিতে ও ধারাবাহিকতায় প্রতিফলিত হয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায় এটি কি কেবল সময়োপযোগী উপস্থিতি, নাকি দীর্ঘদিনের দূরত্ব ঘোচানোর সূচনা? উত্তর দেবে সময়ই। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় আচার ও শহীদদের প্রতি সম্মানের মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা না হলে প্রতীকী শ্রদ্ধাও বিতর্কের জন্ম দিতেই থাকবে।


লেখক:  সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি

ইমেইল: [email protected]


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন