বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আদর্শের গুরুত্ব

বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আদর্শের গুরুত্ব

ফন্ট সাইজ:

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সত্য আরও গভীরভাবে প্রতিফলিত। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদান ও গবেষণার স্থান নয়; এটি জাতীয় চেতনা, ইতিহাসবোধ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের নির্মাণকেন্দ্র। ফলে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদসমূহ কেবল প্রশাসনিক পদ নয়, বরং এগুলো রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক নিরাপত্তা ও আদর্শিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এই বাস্তবতায় আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, কারা এই দায়িত্ব পালন করবেন এবং কোন মানদণ্ডে তাদের নির্বাচন করা হবে।

বিগত সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম হয়েছে, তা আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবাধীন ছিল বলে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক কাঠামোতে এক ধরনের একমুখী প্রভাব তৈরি হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক বহুমতের পরিবেশকে সংকুচিত করে। এই প্রেক্ষাপটে নবগঠিত বিএনপি সরকারের সামনে দায়িত্ব কেবল পূর্ববর্তী প্রভাববলয় মূল্যায়ন করা নয়; বরং একটি নীতিনিষ্ঠ ও আদর্শভিত্তিক পুনর্গঠনের পথ সুস্পষ্ট করা।

বিশেষ করে যখন সরকার নিজেকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের ধারক ও বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদগুলোতে প্রকৃত জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অপরিহার্যতা হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে যে দর্শন ধারণ করে এসেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রচিন্তা। এই দর্শনের প্রতিফলন যদি রাষ্ট্রের নীতিতে থাকে, তবে তা শিক্ষাব্যবস্থার নেতৃত্বেও প্রতিফলিত হওয়া স্বাভাবিক।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। জাতীয়তাবাদী শিক্ষক বলতে কেবল দলীয় পরিচয়ধারী কাউকে বোঝানো হচ্ছে না; বরং বোঝানো হচ্ছে এমন ব্যক্তিত্বকে, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, জাতীয় আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি গভীর অঙ্গীকারবদ্ধ। যিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোপন সমঝোতা বা সুযোগসন্ধানী অবস্থান গ্রহণ না করে নীতির প্রশ্নে দৃঢ় থাকেন। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র নয়, বরং মুক্তবুদ্ধির উন্মুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চান।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক রঙ বদলে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। নির্বাচনের আগে এক ধরনের আদর্শ ধারণ করে প্রশাসন সাজিয়েছেন, আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদল হওয়ার পর নিজেদেরকে নিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এই প্রবণতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর, কারণ এতে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়। তাই আজ প্রয়োজন প্রকৃত জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের চিহ্নিত করা, যারা সময় ও পরিস্থিতির চাপে আদর্শ বদলান না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, যাদের একাডেমিক অবদান প্রশ্নাতীত, প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণিত এবং ব্যক্তিগত জীবন আর্থিকভাবে স্বচ্ছ। জাতীয়তাবাদী আদর্শের জন্য অতীতে ত্যাগ বা দৃঢ় অবস্থানের ইতিহাস থাকলে তা অবশ্যই মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত। কারণ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আদর্শিক দৃঢ়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। যে ব্যক্তি সংকটকালে নীরব থেকেছেন বা সুবিধাবাদী অবস্থান নিয়েছেন, তিনি ভবিষ্যতেও একইভাবে আপস করবেন কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বস্তুনিষ্ঠ যাচাই, প্রামাণ্য তথ্য ও নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য, যাতে দায়িত্বশীল ও আদর্শনিষ্ঠ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা যায়।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির অংশ। কোনো উপাচার্য বা কোষাধ্যক্ষের অনিয়ম, দুর্নীতি বা পক্ষপাতিত্ব কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করে না; তা সরাসরি সরকারের ওপর রাজনৈতিক দায় সৃষ্টি করে। জনগণ সরকারের নিয়োগ সিদ্ধান্তকে তার নৈতিক মানদণ্ডের প্রতিফলন হিসেবে দেখে। ফলে যদি প্রকৃত জাতীয়তাবাদী, সৎ ও দক্ষ শিক্ষকরা এসব পদে আসীন হন, তবে তা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে এবং শিক্ষাঙ্গনে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

এখানে একটি কাঠামোবদ্ধ যাচাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন। প্রার্থীর অতীত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক লেনদেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা এবং একাডেমিক অবদান গভীরভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। তবে এই যাচাই যেন প্রতিহিংসামূলক না হয়; বরং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যোগ্য ও নীতিনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সামনে নিয়ে আসা। যারা সত্যিকার অর্থে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে আসার যোগ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আঁতুড়ঘর। এখান থেকে যে প্রজন্ম বেরিয়ে আসে, তারা রাষ্ট্রের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, ব্যবসা, গবেষণা ও রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব আদর্শিকভাবে দৃঢ়, নৈতিকভাবে স্বচ্ছ এবং জাতীয় চেতনার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তবে সেই প্রভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রতিফলিত হবে। তারা আত্মমর্যাদাবোধ, সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠবে। অন্যদিকে যদি নেতৃত্ব সুবিধাবাদী বা গোপন আনুগত্যে পরিচালিত হয়, তবে শিক্ষার্থীরাও বিভ্রান্ত বার্তা পাবে।

বর্তমান সময়ে জাতীয়তাবাদকে অনেকেই সংকীর্ণ রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করতে চান। কিন্তু প্রকৃত জাতীয়তাবাদ হলো একটি ইতিবাচক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন, যা দেশের সার্বিক উন্নয়ন, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে এই চেতনার প্রতিফলন থাকা মানে ভিন্নমত দমন করা নয়; বরং একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় সুসংহত করা।

অতএব এখন সময় এসেছে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে প্রকৃত জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের নিয়োগ নিশ্চিত করা শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণ নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নীতিনিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হবে। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা দৃঢ় হবে।

দিনশেষে ইতিহাস বিচার করে কে কোন সময়ে কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যদি আজ যোগ্য, সৎ ও বোনা ফাইড জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব অর্পণ করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এটিকে একটি দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে দেখবে। আর যদি সুযোগসন্ধানী ও রঙ বদলানো ব্যক্তিদের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তার মূল্য দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হবে। তাই আজকের এই মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই সময়ের দাবি, এবং সেই সঠিক সিদ্ধান্ত হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদগুলোতে প্রকৃত জাতীয়তাবাদী, নৈতিক ও দক্ষ শিক্ষকদের নিয়োগ নিশ্চিত করা।


লেখক: শিক্ষক, পরিসংখ্যান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন