কেপ ভার্দের ইতিহাসের নায়ক ভোজিনিয়া

কেপ ভার্দের ইতিহাসের নায়ক ভোজিনিয়া

ফন্ট সাইজ:

আগের দিন কুরাসাওকে নিয়ে ছেলে খেলায় মেতে উঠেছিল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। গুনে গুনে সাতবার তারা বল পাঠিয়েছিল নবাগত দেশটির জালে। মেক্সিকোয় স্পেন ও কেপ ভার্দের ম্যাচের ফলাফলও তেমনই হবে-এমনটাই ভেবেছিল অনেকে। সে ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে কেপ ভার্দে। আগের দিন কুরাসাও যা পারেনি, স্পেনকে রুখে দিয়ে তাই করে দেখিয়েছে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ৬৭ নম্বরে থাকা দেশটি। যার পুরো কৃতিত্ব কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার। পেদ্রি, ফেরান তোরেসরা পারেননি তাঁর দেয়াল ভাঙতে। ৭১ মিনিটে বদলি হিসেবে নেমে চেষ্টা করেছেন লামিনে ইয়ামাল। তাঁর প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে ৬ ফুট ২ ইঞ্চির ভোজিনিয়ার বিশ্বস্ত হাতে। ম্যাচে কমপক্ষে সাতটি নিশ্চিত গোল সেভ করেছেন ৪০ বছর বয়সি এই গোলরক্ষক। তাঁর এই অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্সে ভর করেই নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্পেনের মতো পরাশক্তিকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে রেখে ঐতিহাসিক এক পয়েন্ট অর্জন করল কেপ ভার্দে। সেটাও বিশ্বকাপে তাদের অভিষেক ম্যাচে!

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে আছে ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ। এই দ্বীপগুলোর সমন্বয়ে গঠিত কেপ ভার্দে। ১৯৭৫ সালে পাঁচ শতাব্দীর বেশি সময়ের পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা পায় দেশটি। জনসংখ্যা ছয় লাখের কম। গতকাল এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের বিপক্ষে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামে স্পেন। প্রথমার্ধের মাঠের লড়াইয়ে বলের দখল পুরোপুরি স্পেনের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কিন্তু ম্যাচের শেষ পাঁচ মিনিটের আগ পর্যন্ত সেই বলের দখল রেখে খুব একটা ধার ছড়াতে পারেনি তারা। তবে প্রথমার্ধের শেষদিকে এসে খোলস ছেড়ে বের হয় স্প্যানিশরা। তোরেস গোল করার এক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন, তাঁর শটটি প্রতিহত হয় ক্রসবারে লেগে। ফিরতি বলে ওইয়ারসাবালের নেওয়া হেড দুর্দান্তভাবে রুখে দেন ভোজিনিয়া। ৪০ বছর বয়সি কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষক যেন এদিন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ২ নম্বরে থাকা দলটির সামনে। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে তোরেস ও লাপোর্তের দুটি নিশ্চিত আক্রমণ নষ্ট করে আটলান্টা স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধের সমতা (০-০) ধরে রাখেন কেপ ভার্দে। দ্বিতীয়ার্ধে আরও মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছে স্পেন। ম্যাচের ৭১ মিনিটে লামিনে ইয়ামালকে মাঠে নামান স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। মাঠে নেমেই নতুন রেকর্ড গড়েন এই বার্সা তারকা। ১৮ বছর ৩৩৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ও ইউরোতে অংশ নেওয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি। আগের রেকর্ডটি ছিল ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহামের। তিনি প্রথমবার ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ ইউরো কাপে অংশ নিয়েছিলেন ১৯ বছর ১৪৫ দিন বয়সে। এই ম্যাচে বয়সের রেকর্ড হয়েছে আরও একটি। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ারও এই ম্যাচ দিয়েই বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটেÑ৪০ বছর ২২ দিন বয়সে। ভোজিনিয়া ও ইয়ামালের মধ্যে বয়সের ব্যবধান ২১ বছর ৪৫ দিন! বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে দুই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি বয়সের ব্যবধান। চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সি একাদশ নিয়ে মাঠে নামার রেকর্ডও গড়ে কেপ ভার্দে। স্পেনের বিপক্ষে তাদের শুরুর একাদশের গড় বয়স ছিল ৩১ বছর ২৬ দিন। বয়স্ক দলটির বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমেও ইয়ামাল স্পেনের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি। তবে ইয়ামাল আসার পর স্পেনের খেলায় কিছুটা গতি এলেও কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ টলানো যায়নি। ৮৬ মিনিটে স্পেনের হতাশার চূড়ান্ত রূপটি দেখা যায়। রদ্রি বক্সের বাইরে থেকে ধৈর্য হারিয়ে এলোপাতাড়ি এক শট মেরে বসেন, যা চলে যায় বারের অনেক ওপর দিয়ে। রদ্রিকে তুলে নিয়ে নিকো উইলিয়ামসকে নামিয়ে শেষ জুয়াটা খেলেছিল স্পেন। কিন্তু ৮৮ মিনিটে ওইয়ারসাবাল যখনই গোলের জন্য পা বাড়িয়েছিলেন, তখনই আক্ষরিক অর্থেই নিজের শরীরকে কামানের গোলার মতো ছুঁড়ে দেন কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার পিকো লোপেস। মাথা দিয়ে বলটি ক্লিয়ার করে তিনি দলকে বাঁচিয়ে অমরত্বের স্তরে নিয়ে যান। নাটকীয়তার তখনও বাকি ছিল। ৯০ মিনিটে রূপকথাকে আরও অবিশ্বাস্য বানানোর সুযোগ চলে এসেছিল কেপ ভার্দের সামনে। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে কেভিনের শট ওলমোর পায়ে লেগে কর্নার হলে পুরো স্টেডিয়ামের শ্বাস যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। সেই কর্নার থেকে বোরগেসের নেওয়া হেডটি সরাসরি স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমোনের হাতে না গেলে হয়ত এদিন স্পেনের পরাজয়ের গল্প লিখতে হতো। একবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ৮০১টি পাস খেলেও কেপ ভার্দের জালে বল পাঠাতে পারেনি। স্পেন যে চেষ্টা করেনি তা নয়-মরিয়া হয়েই খেলেছে। বল দখলে যোজন এগিয়ে ছিল স্প্যানিশরা। যেখানে স্পেনের বল দখল ছিল ৭৪ শতাংশ, সেখানে কেপ ভার্দের ২৬ শতাংশ। পাসের সফলতাও ছিল চমৎকারÑ৯২ শতাংশ। তবে ২৭টি শট নিয়ে পোস্টে রাখতে পেরেছে মাত্র ৭টি। বল পোস্টেও লেগেছে। যোগ করা ৫ মিনিট শেষ হওয়ার পর কেপ ভার্দে বুঝিয়ে দেয়-মাঠে নামের ভার নয়, শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করাটাই শেষ কথা। এই ড্র স্পেনের জন্য বেশ লজ্জার, কিন্তু কেপ ভার্দের জন্য অনাবিল আনন্দের। ফুটবল কেন অপরাজেয়, বিশ্বকাপ কেন সুন্দর-আটলান্টার এই ঐতিহাসিক রাত আরও একবার তা প্রমাণ করে দিল।

আগামী ২২ জুন উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচ খেলবে কেপ ভার্দে। স্পেনের পরের ম্যাচ ২১ জুন সৌদি আরবের বিপক্ষে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন