এক নারীকে অপহরণ, নির্যাতন ও ধর্ষণের দায়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত গগণদীপ সিংকেবৃটেনে ৩৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ৩৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ফেব্রুয়ারিতে দুইটি ধর্ষণ, অপহরণ, বেআইনিভাবে আটক রাখা এবং পরিকল্পিতভাবে গুরুতর শারীরিক ক্ষতি করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। মামলাটি শুনানি হয় ইলিংওয়ার্থ ক্রাউন কোর্টে। এ খবর দিয়ে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, শুক্রবার তাকে সাজা দেয়া হয়। তাকে ২৮ বছর কারাগারে কাটাতে হবে। এরপর ৬ বছরের বর্ধিত শর্তাধীন পর্যবেক্ষণে থাকবে। অন্তত ১৮ বছর সাজা না কাটানো পর্যন্ত সে প্যারোলের জন্য বিবেচিত হবে না। সাজা শেষ হলে তাকে বৃটেন থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি শুরু হয় ২০২৪ সালের জুনে। ওই সময় ২৪ বছর বয়সী এক নারী থাইল্যান্ড থেকে বৃটেনে একটি স্যুটকেস বহন করেন। এ বিষয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে পুলিশ। কারণ তাকে ওই ব্যাগে অজানা জিনিস বহন করতে বলা হয়েছিল। তিনি তা অস্বীকারও করেন। পরে বলা হয় মুখোশধারী কয়েকজন পুরুষ তাকে বার্মিংহাম বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নেয় এবং পশ্চিম লন্ডনের হ্যানওয়েলে একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। আদালতে বলা হয়, সেখানে তাকে দীর্ঘ সময় ধরে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং গগণদীপ সিং তাকে দু’বার ধর্ষণ করে। এক দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা ওই নির্যাতনের মধ্যে ছিল মারধর, ঘুষি, পেটানো, পোশাক খুলে ফেলা, চাবুক মারা এবং আগুনে পোড়ানোর মতো সহিংসতা। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং কাউকে কিছু না বলার হুমকি দেয়া হয়।
তদন্তকারীরা জানান, ভয় ও ট্রমার কারণে ভুক্তভোগী প্রথমে পুরো ঘটনা জানাতে দ্বিধা করেন। পরে তার মা এবং বিশেষায়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের সহায়তায় তিনি বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তদন্তের নেতৃত্ব দেয়া ডিটেকটিভ কনস্টেবল সীতারা আবদুল ভুক্তভোগীর সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই ঘটনায় ভুক্তভোগী যে ভয়াবহ বর্বরতার মুখোমুখি হয়েছেন তা কল্পনাতীত। তিনি সামনে এসে ন্যায়বিচারে সহায়তা করার মাধ্যমে অসাধারণ সাহস দেখিয়েছেন। অপরাধীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ তাকে নিজের জীবন নিয়েও ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, তাকে চুপ করানোর জন্য হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু তার মায়ের সহায়তা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যত্নশীল ভূমিকার কারণে আমরা এই অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত করতে পেরেছি। আবদুল বলেন, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীর দৃঢ়তা ছিল অসাধারণ।
তিনি বলেন, আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। এই তদন্ত ও বিচার চলাকালীন তার ধৈর্য, সাহস এবং দৃঢ়তা প্রশংসনীয়। এমন ভয়াবহ অপরাধের মুখেও তার শক্তি ও মানসিক দৃঢ়তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। মামলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে যখন ভুক্তভোগীর মা তার মেয়ের পরা পোশাক সংরক্ষণ করেন। পরে ফরেনসিক পরীক্ষায় সেই পোশাক থেকে ডিএনএ মিল পাওয়া যায়, যা গগণদীপ সিংয়ের সঙ্গে অপরাধের সংযোগ স্থাপন করে। পুলিশের মাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে ভুক্তভোগী বলেন, শুরুতে তিনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ভয় পাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, আমি কখনোই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইনি। এটা খুব ভীতিকর মনে হচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম, যদি আমি অভিযোগ করি, তাহলে আমি এবং আমার আশপাশের মানুষ বিপদে পড়তে পারি।
তিনি তার মায়ের সাহসিকতার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমার মা কখনো হাল ছাড়েননি। তিনি বিশ্বাস করতেন পুলিশের কাছে যাওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত। তিনি আমার কাপড় প্রমাণ হিসেবে রেখে দেন এবং আমার সব চিকিৎসা নথি সংরক্ষণ করেন। তিনি বলেন, তিনি শান্তিতে থাকতে পারবেন না যদি জানেন অন্য কারও সঙ্গে এমন হচ্ছে। নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি আরও বলেন, যে কেউ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন- যৌন বা অন্য যেকোনো ধরনের, তাদের মনে রাখতে হবে, লজ্জা আমাদের নয়। আমরা বেঁচে থাকি এবং আবার জীবন শুরু করি।
ভুক্তভোগীর মা আরও বলেন, তার মেয়ে প্রথমে এগোতে না চাইলেও তদন্তকারীরা পেশাদারিত্ব ও সহানুভূতির সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, আমি যখন মেট্রোপলিটন পুলিশে যোগাযোগ করি, তারা খুব পেশাদার ও সংবেদনশীলভাবে সাড়া দেন এবং আমাকে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে অভিযোগ করার বিষয়েও আশ্বস্ত করেন। পরিবার হিসেবে তারা পুরো সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাদের কাজ আমাদের একটি ধরনের মানসিক শান্তি দিয়েছে এবং আমরা নিশ্চিত যে একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি এখন সমাজ থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
