ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও হামলা স্থগিত করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান গোপন আলোচনার বিষয়ে নেতানিয়াহু অনেকটাই অন্ধকারে ছিলেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি তথ্য জানার চেষ্টা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিত্র সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এখন দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এক সময় যারা সমন্বিতভাবে এই সংঘাতে জড়িয়েছিল, এখন তাদের লক্ষ্য ও স্বার্থ ভিন্ন পথে এগোচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্রুত সংঘাতের সমাপ্তি চান, বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপের কারণে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু চলতি বছরই নির্বাচনী চাপের মুখে রয়েছেন এবং যুদ্ধ শুরুর সময় যে লক্ষ্যগুলো তিনি নির্ধারণ করেছিলেন, সেগুলো পূরণ করাই এখন তার প্রধান অগ্রাধিকার।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ জানান, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি খসড়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইরানে পূর্বনির্ধারিত হামলা ও বোমাবর্ষণ বাতিল করেছেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানসহ কয়েকটি দেশ এই আলোচনায় নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহু, কাতারের আমির এবং অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী রোববার জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।
ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয় ইসরাইল। তবে তারা জানিয়েছে, সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ধ্বংস, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধের বিষয়গুলো থাকা উচিত- এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুতে দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্য এখন ভিন্ন দিকে যাচ্ছে। ট্রাম্প দ্রুত একটি সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাত শেষ করতে চান, যেখানে ইসরাইল দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপ বজায় রেখে ইরান ও তার সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই মতপার্থক্যের কারণে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে।
অভ্যন্তরীণ চাপ ও রাজনৈতিক হিসাব যুক্তরাষ্ট্রে
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বৃদ্ধির সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প, যা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে ইসরাইলে হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতে এখনো পূর্ণ বিজয় না পাওয়ায় সমালোচনার মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু।
গাজা, লেবানন এবং ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা তার সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কেও টানাপোড়েন
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একটি ফোনালাপে তিনি নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ জানান।
অ্যাক্সিওসের সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্প এক পর্যায়ে নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় প্রশ্ন করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তার কৌশল নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই নেতার সম্পর্ক এখন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একদিকে কৌশলগত জোট বজায় রাখার চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ- দুই পক্ষকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করছে।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, ইসরাইলের একটি বড় অংশ এখনো যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পক্ষে, তবে সরকারের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে।
সব মিলিয়ে ইরান সংকট ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্ক নতুন করে টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে।
