বাংলা: শাসিতের ভাষা

বাংলা: শাসিতের ভাষা

ফন্ট সাইজ:

একটি জাতিকে শাসন করতে চাইলে প্রথমে তার ভাষাকে দুর্বল করে দিতে হয়। কারণ ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, ভাষা মানুষের চিন্তা, আত্মপরিচয় এবং আত্মমর্যাদার ভিত্তি। যে জাতির ভাষা শাসিত, সেই জাতির মনও শাসিত। বাংলা ভাষার ইতিহাস সেই শাসিত হওয়ার ইতিহাস, আবার সেই শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ইতিহাসও।

বাংলা বহুদিন ধরেই শাসিতের ভাষা। এই ভূখণ্ডের মানুষ বাংলায় কথা বলেছে, বাংলায় স্বপ্ন দেখেছে, বাংলায় ভালোবেসেছে—কিন্তু ক্ষমতার ভাষা ছিল অন্যের। শাসকের ভাষা ছিল ফারসি, পরে ইংরেজি, তারপর উর্দু। বাংলা ছিল সাধারণ মানুষের ভাষা, কৃষকের ভাষা, মজুরের ভাষা—কিন্তু শাসকের ভাষা ছিল না। এই ভাষাগত বৈষম্যের চরম রূপ দেখা যায় পাকিস্তান আমলে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শুধু একটি ভাষাকে নয়, একটি জাতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালি মাথা নত করেনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিল—ভাষা তাদের আত্মা, ভাষা তাদের পরিচয়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছিল, কিন্তু সেই সংগ্রাম কি সত্যিই শেষ হয়েছে?

আজ দৃশ্যপট পাল্টেছে, কিন্তু বাস্তবতা কি পাল্টেছে?
আজ আর কেউ প্রকাশ্যে বাংলা ভাষা নিষিদ্ধ করছে না, কিন্তু নীরবে, কৌশলে বাংলাকে দুর্বল করা হচ্ছে। আজকের শাসন আরও সূক্ষ্ম, আরও গভীর। আজ আমাদের মনকে শাসন করা হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস করানো হচ্ছে—নিজের ভাষা যথেষ্ট নয়, অন্যের ভাষাই শ্রেষ্ঠ।
আজ আমরা দেখি, অনেক শিক্ষিত মানুষ বাংলা বলতে সংকোচ বোধ করেন। তারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারাকে গর্ব মনে করেন। বাংলায় কথা বলাকে তারা পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ মনে করেন। সন্তানদের বাংলা শেখানোর চেয়ে ইংরেজি শেখানোকে বেশি গুরুত্ব দেন। যেন বাংলা জানাটা নয়, বাংলা ভুলে যাওয়াটাই উন্নত হওয়ার চিহ্ন।

এটা কি স্বাধীনতার লক্ষণ? নাকি এটি মানসিক পরাধীনতার প্রমাণ?
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই শাসন এখন আর বাইরে থেকে আসছে না—এটি আমাদের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে। আমরা নিজেরাই নিজের ভাষাকে ছোট করছি। নিজের ভাষায় কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছি। নিজের ভাষাকে অযোগ্য মনে করছি।

একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় পরাজয় আর কী হতে পারে?
আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, আমরা নিজের ভাষার মধ্যেই বিভেদ সৃষ্টি করছি। আঞ্চলিক ভাষাকে অবজ্ঞা করছি, প্রমিত ভাষাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছি। ফলে বাংলা তার নিজস্ব শক্তি হারাচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি—এই সব রূপ মিলিয়েই বাংলা ভাষা পূর্ণতা পেয়েছে।
ভাষা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার ভাষাভাষীরা সেই ভাষায় গর্ববোধ করে। কিন্তু আজ আমরা সেই গর্ব হারাতে বসেছি। আমরা ভাষার স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু ভাষার মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারিনি।

আজ প্রয়োজন আরেকটি ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলন রাজপথে নয়, এই আন্দোলন আমাদের মননে। এই আন্দোলন নিজের ভাষাকে ভালোবাসার আন্দোলন। নিজের ভাষায় কথা বলার আন্দোলন। নিজের ভাষাকে সম্মান করার আন্দোলন।
আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি অন্যের ভাষার ছায়ায় বেঁচে থাকব, নাকি নিজের ভাষার আলোয় মাথা উঁচু করে দাঁড়াব?

বাংলা কোনো দুর্বল ভাষা নয়। বাংলা রবীন্দ্রনাথের ভাষা, নজরুলের ভাষা, জীবনানন্দের ভাষা। বাংলা একটি সমৃদ্ধ, শক্তিশালী, জীবন্ত ভাষা। কিন্তু এই ভাষার শক্তি নির্ভর করছে আমাদের উপর।
আমরা যদি বাংলা ভুলে যাই, বাংলা দুর্বল হয়ে যাবে। আমরা যদি বাংলা নিয়ে গর্ব করি, বাংলা শক্তিশালী হবে।
আজ আমাদের শপথ নিতে হবে—বাংলা আর শাসিতের ভাষা হয়ে থাকবে না।
বাংলা হবে শাসকের ভাষা।
বাংলা হবে জ্ঞানের ভাষা।
বাংলা হবে মর্যাদার ভাষা।
কারণ বাংলা আমাদের ভাষা নয়, বাংলা আমাদের অস্তিত্ব।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন