খুলনার কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল বাকীর বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতিহিংসামূলক আচরণ এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন উপজেলার আমাদী হাটের ইজারাদার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তার দাবি, বখশিশের টাকা দিতে না পারায় প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তার অস্থায়ী ঘর উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমিশন গ্রহণ, হাট-বাজার ও খাল ইজারায় অনিয়ম এবং এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারী মিজানুর রহমান বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রতিকার চেয়ে সংবাদ সম্মেলনসহ খুলনা জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এমনকি ইউএনওর ড্রাইভারের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন একাধিক অভিযোগকারী।
লিখিত অভিযোগে মিজানুর রহমান উল্লেখ করেন, গত ১৮ মার্চ উপজেলা প্রশাসনের আহ্বানে আমাদী হাটের বাংলা ১৪৩৩ সনের এক বছরের ইজারায় অংশ নিয়ে তিনি সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত অর্থ জমা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে হাট পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, হাট পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মচারীদের বসার জন্য বাজার এলাকায় একটি অস্থায়ী ঘর নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। বিষয়টি তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করলে ইউএনও মৌখিকভাবে সম্মতি দেন। সেই অনুযায়ী বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনি দিয়ে একটি অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হয়। ঈদুল আজহার আগে ইউএনওর কার্যালয়ে দেখা করতে গেলে তার এক সহকারী ইউএনওর জন্য ৩০ হাজার টাকা ‘ঈদ খরচ’ দাবি করেন। মিজানুর রহমানের দাবি, তখন তিনি আর্থিক সংকটের কথা জানিয়ে ১০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন এবং বাকি টাকা পরে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় ইউএনও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তাকে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন।
অভিযোগে বলা হয়, পরে ইউএনওর সহকারী তাপসের মাধ্যমে তিনি ১০ হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু এরপরও চাপ অব্যাহত থাকে। ঈদের পর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব সিরাজুল ইসলাম তাকে ডেকে নিয়ে আরও ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই টাকা দিলে ঘর নিয়ে আর কোনো সমস্যা হবে না বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে তার দাবি। মিজানুর রহমান জানান, পরবর্তীতে তিনি নায়েবকে পাঁচ হাজার টাকা দেন। কিন্তু গত ৮ জুন উপজেলা প্রশাসনের লোকজন কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই তার নির্মিত ঘরটি ভেঙে দেয়। তিনি বলেন, অন্তত একটি নোটিশ দেওয়া হলে তিনি ঘরের মালামাল সরিয়ে নিতে পারতেন। তার অভিযোগ, বাজারের সরকারি জায়গায় আরও অন্তত ১১টি পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা থাকলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র তার ঘরটিই উচ্ছেদ করা হয়েছে।
শুধু ব্যক্তিগত হয়রানির অভিযোগ নয়, লিখিত বক্তব্যে ইউএনও আব্দুল্লাহ আল বাকীর বিরুদ্ধে আরও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছেন তিনি। তার দাবি, কয়রায় যোগদানের পর থেকে ইউএনও বিভিন্ন ইজারা, প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনেও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি ইউএনওর ড্রাইভারের বিরুদ্ধেও পানির ট্যাংকি দেওয়ার কথা বলে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন অভিযোগকারী। মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, পানির ট্যাংকি দেওয়ার আশ্বাস দেয় ইউএনওর ড্রাইভার জাহাঙ্গীর হোসেন। ইউএনওকে অর্থ দিতে হবে বলে ৪০ হাজার টাকা নেয় ড্রাইভার জাহাঙ্গীর হোসেন। কয়েকমাস পার হলেও ট্যাংকিও দেননি এবং সেই টাকাও ফেরত দেয়নি জাহাঙ্গীর। বিষয়টি নিয়ে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাইনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, একজন মানুষ অভিযোগ দিলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। তাকে ঘর সরিয়ে নেওয়ার জন্য একাধিকবার বলা হলেও সে ঘর তোলেনি। এজন্য সেটি উচ্ছেদ করা হয়েছে। আর পানির ট্যাংকি দেওয়ার কথা বলে ড্রাইভার জাহাঙ্গীর হোসেন টাকা নিয়েছে কিনা আমি জানিনা। তবে একটা লিখিত অভিযোগ এসেছে। আমি তাকে সতর্ক করে দিয়েছি এবং ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছি। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
