বালুমহল দখল নিতে পদ্মার চরে ৩ সন্ত্রাসী বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধ

ফন্ট সাইজ:

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, পাবনার ঈশ্বরদী, নাটোরের লালপুর এবং রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বিস্তীর্ণ পদ্মা চরাঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর আধিপত্য বিস্তার, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘাত ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। মাঝে মধ্যে সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা গোলাগুলি ও বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে, যার ফলে হতাহত ও প্রাণহানির ঘটনাও বাড়ছে।

তথ্যমতে, বালু উত্তোলন এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্বার্থ এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। বালুঘাট দখল, চরাঞ্চলের ফসলি জমির নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষ ও গোলাগুলি সংঘটিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে একে-৪৭ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রসহ আধুনিক ও ভারী অস্ত্র রয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলির ঘটনায় আজিজুল হক ওরফে ঝড়ু মাস্তান (৩৫) নামে একজন নিহত হন। প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে চলা গোলাগুলিতে শতাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ২৭শে অক্টোবর পদ্মার চরে খড়ের মাঠ দখলকে কেন্দ্র করে কাঁকন বাহিনী ও মণ্ডল বাহিনীর মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়। বন্দুকযুদ্ধে মণ্ডল বাহিনীর আমান মণ্ডল (৩৬) ও নাজমুল মণ্ডল (২৬) এবং কাঁকন বাহিনীর লিটন (৩০)সহ ৩ জন নিহত হন।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র মতে, দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ১৪ হাজার মৌজায় দৌলতপুরের লালচাঁদ বাহিনী ও রাখি বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বেলাল ওরফে মণ্ডল বাহিনীর সদস্যরা একত্রিত হয়ে কাঁকন বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে গোলাগুলি ও বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এতে কাঁকন বাহিনীর সদস্য আজিজুল হক ঝড়ু নিহত হন এবং আরও অন্তত ৫ থেকে ৬ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে আহতদের নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি। নিহত ঝড়ু নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার পাবনাপাড়া গ্রামের আব্দুল শেখ-এর ছেলে। তিনি কাঁকন বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত বালুমহালে কাজ করতেন ।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, সম্প্রতি সরকারি ইজারার মাধ্যমে বালু উত্তোলনের অনুমতি পান কাঁকন বাহিনীসহ ১২ জন ইজারাদার। অভিযোগ রয়েছে, ইজারা কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী ও বেলাল (মণ্ডল) বাহিনীর সদস্যরা ইজারাদারদের কাছ থেকে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দাবি করে আসছিল। এ ঘটনার জের ধরে মঙ্গলবার সকালে ঝড়ুকে মারধর করা হয় এবং তার কাছ থেকে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ঝড়ু বিষয়টি কাঁকন বাহিনীর লোকজনকে জানালে তার সশস্ত্র সদস্যরা দু’টি স্পিডবোটে ঘটনাস্থলে যায়। তারা দৌলতপুর উপজেলার ১৪ হাজার মৌজার কলাবাগান সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে প্রতিপক্ষ লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী ও মণ্ডল বাহিনীর সন্ত্রাসীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। জবাবে কাঁকন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে বন্দুকযুদ্ধের একপর্যায়ে আজিজুল হক ওরফে ঝড়ু মাস্তান গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

ঘটনার খবর পেয়ে কুষ্টিয়া, বাঘা, ঈশ্বরদী ও লালপুর থানা পুলিশের সদস্যরা পদ্মা নদীর বিভিন্ন চরাঞ্চলে অভিযান ও তল্লাশি চালান। পরে মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে লালপুর উপজেলার চরজাজিরা এলাকায় পদ্মা নদীর তীর থেকে একটি স্পিডবোটের ভেতর রক্তাক্ত অবস্থায় ঝড়ু মাস্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি সবুজ-নীল রঙের স্পিডবোটও জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন লক্ষীকুন্ডা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খন্দকার শফিকুল ইসলাম, লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম এবং ওসি (তদন্ত) এস এম রিয়াজুল হাসা। তারা জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, বাঘা সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে এবং নাটোরের একজন নিহত হয়েছেন। বিষয়টি নৌপুলিশ তদন্ত করছে। এ ঘটনায় ভারী অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভেড়ামারা সার্কেল) দেলোয়ার হোসেন বলেন, চরাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। কতো রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সন্ত্রাসীরা আধুনিক ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। চরাঞ্চলে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আধিপত্য এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে চরবাসীর দাবি সন্ত্রাসীদের দমন ও নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন