মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমস্যার শুরুতেই সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শুধুমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, বরং ব্যক্তি পর্যায় থেকে সরকারের অন্য সকল বিভাগের নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তা ছাড়া, দেশের সকল মানসিক রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণসহ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য আইন-২০১৮ এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি উঠে এসেছে। রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নাগরিক অধিকার ও কাঠামোগত সংস্কার বিষয়ক বহুপক্ষীয় পরামর্শ’ শীর্ষক একটি সভায় এসব উঠে আসে। সভায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দারসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখেন। সভাটি আয়োজন করে ‘ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশন’ ও ‘হিরোজ ফর অল’- নামক দুটো সংস্থা।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যের বরাত দিয়ে সংস্থা দু’টি জানিয়েছে, ২০২৩ সালে দেশে অন্তত ১৪ হাজার ৪৩৬টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আত্মহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশেও আত্মহত্যা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক সুস্থতার অবনতি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। তারা বলছে, একজন পুলিশ সদস্য বা ব্যাংক কর্মকর্তাসহ একাধিক আত্মহত্যার ঘটনা কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান মানসিক চাপ, ট্রমা ও বার্নআউটের মতো গভীর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটকে সামনে এনেছে। তেমনই নিজ বাসভবনে প্রবীণ মায়ের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা আমাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব এবং প্রবীণদের জন্য দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, স্থানীয় সরকার, শ্রম, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সুরক্ষা ও কমিউনিটি ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনা-দুর্ঘটনা জনগণের মনে অনিরাপত্তা, ভীতি, অস্বস্তি থেকে শুরু করে গভীর ট্রমা তৈরি করছে; যা এখনি সারিয়ে তোলার উদ্যোগ না নিলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।
সভায় ড. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, আমরা চাই মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নিয়ে যেতে। কারও যদি মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়, ওই অবনতির শুরুতেই সেই ব্যক্তিকে আইডেন্টিফাই করতে চাই এবং তাকে কাউন্সেলিং দিতে চাই। যদি কাউন্সেলিংয়ে কাজ না হয়, তাকে প্রাইমারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যদি যথাসময়ে চিকিৎসা দিতে হয়, সেটা আমরা শুরু করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের প্রাইমারি হেলথ কেয়ারকে সার্বজনীন করতে চাই। আমরা চাই বাংলাদেশের গ্রামের প্রত্যেকটা ইউনিয়নে একটা করে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট থাকবে; শহরের প্রত্যেকটা ওয়ার্ডে একটা করে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট থাকবে। বাংলাদেশে এখন ৪১ থেকে ৪২ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী আছে। তারা ফ্রন্টলাইন কর্মী। আমরা আরও এক লাখ নিয়োগ দিতে চাই, যাতে করে আমার-আপনার প্রত্যেকের ঘরে অন্তত দুই মাস পর পর একজন স্বাস্থ্যকর্মী টোকা দেয়। তিনি বলেন, প্রত্যেকটা জেলার চারদিকে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে আমরা একটা সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার ইউনিট তৈরি করতে চাই। যার কেন্দ্রবিন্দু হবে জেলা হাসপাতাল, চারদিকে থাকবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
সেখানে আমরা মানসিক স্বাস্থ্যকে অত্যাবশ্যকীয় প্যাকেজ হিসেবে যোগ করতে চাই।
সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব নিঃসন্দেহে আমাদের সবার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। এই টোটাল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অ্যাটেনশন প্রয়োজন, তার প্রায় ৯০ শতাংশই কিন্তু সেবার বাইরে থাকছে। সমস্যা হচ্ছেÑ স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী অপ্রতুলতা। আমার এখন পর্যন্ত জানা মতে, আমাদের সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যা ৩০০ প্লাস। আমাদের সাইকোলজিস্টের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কিন্তু অত্যন্ত সজাগ। তাদের যে নির্বাচনী ইশতেহার, সেখানে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজের কথা বলা হয়েছে। আমাদের যদি ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজের পর্যালোচনা করতে হয়, সেক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের এই মানসিক রোগের ও স্বাস্থ্যের যে অংশটি, সেটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এবং তাদের শুধু অগ্রাধিকার দিয়েই স্বীকৃতি দিলে হবে না, সেখানে ব্যবহারকারীদের এবং আর্থিক যেসব বিষয়গুলো আছে, এগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।
ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান বলেন, আমরা চাই কোনো মানুষ যেকোনো কারণেই হোক না কেন, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে যেন বঞ্চিত হতে না হয়। শুরুতেই মানসিক সমস্যার চিকিৎসা করালে সমস্যা এত দূর গড়ায় না, কিংবা খরচও কমে যায়। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে শিক্ষা, যুব এসব মন্ত্রণালয় কেন কাজ করছে না? তারাও তো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে পারে। কেন শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই করতে হবে?
