ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সামগ্রিকভাবে আশাব্যঞ্জক ও সম্ভাবনাময় হিসেবে মূল্যায়ন করলেও সুশাসন, দুর্নীতি দমন এবং জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি খুন এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবি’র কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘শততম দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের মূল্যায়নের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের চিত্র তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতিবাচক কিছু উদ্যোগ থাকলেও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি। অধিকাংশ সংসদীয় কমিটি গঠন না হওয়া এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট নয় বলেও উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত ‘অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র’ শীর্ষক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি, আর চুরির ঘটনা ২ হাজার ২১৪টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৪৯৬টি। এ ছাড়া আলোচিত সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশু ৪৯ থেকে ৭১ জন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের গঠনের ১০০ দিনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিশন গঠনের জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে।
টিআইবি’র পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়া হলেও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থক, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ীসহ প্রায় সব পেশাজীবীর অনেকের মধ্যেই দৃশ্যমান ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা লক্ষণীয়। পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ও গোষ্ঠী বিবেচনায় নিয়োগ-পদায়ন অব্যাহত, যা বিএনপি’র নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় শক্তির উত্থান ও দেশব্যাপী বহুমত-বহুধর্মী-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর সহিংস ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নির্বাচিত সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, সবশেষ দৃষ্টান্ত ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহ আলীর মাজারে এবং কুষ্টিয়ায় একজন পীরের ওপর হামলা হয়েছে, যা মুক্তচিন্তা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বৈচিত্র্যের সহাবস্থান এবং সহিষ্ণু আচরণের ধারক-বাহক, তথা দেশবাসীর জন্য অশনিসংকেত।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি আইনে পরিণত করার উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, জবাবদিহিমূলক সরকার পরিচালনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো রহিত করা বা অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্থগিত করার মাধ্যমে কার্যত ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দেয়।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন-সংক্রান্ত যেসব আইন সামান্য কিছু সংশোধন করে পাস করা যেত। কিন্তু সরকার তা বাতিল বা স্থগিত করেছে। অন্যদিকে যেসব আইন নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে, এমন অনেক আইন পাস করা হয়েছে।
টিআইবি’র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের ১০০ দিন একদিকে আশাজাগানিয়া ও সম্ভাবনাময়। অন্যদিকে সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিশেষ করে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণে সুনির্দিষ্ট পথরেখা বা উদ্যোগের ঘাটতির দিকটি উদ্বেগজনক।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, গবেষণা সহযোগী মো. সহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
