কফিনে ফিরলেন ২ রেমিট্যান্স যোদ্ধা

কান্নায় ভারী সাতক্ষীরার আকাশ

কফিনে ফিরলেন ২ রেমিট্যান্স যোদ্ধা

ফন্ট সাইজ:

জীবিকার তাগিদে গিয়েছিলেন সুদূর লেবাননে। স্বপ্ন ছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর। কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই কফিনবন্দি হয়ে ফিরতে হলো জন্মভূমিতে। লেবাননে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের মরদেহ রোববার সকালে নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় মুহূর্তেই শোকের জনপদে পরিণত হয় দুই গ্রাম। শনিবার গভীর রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় তাদের মরদেহ।

সেখানে সরকারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন পরিবারের সদস্যরা। পরে এম্বুলেন্সযোগে মরদেহ সাতক্ষীরায় নিয়ে আসা হয়।
গত ১১ই মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় নিজ বাসভবনে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলাম (২০)। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হলো। রোববার সকাল থেকেই নিহতদের বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একনজর মরদেহ দেখতে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে সেখানে উপস্থিত হন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।

তবে সান্ত্বনার ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছিলেন সবাই। কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন স্বজনরা।
ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু জানান, বিমানবন্দরে সরকারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মরদেহ গ্রহণের পর নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নেয়া হয়েছে। জোহরের নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হবে। নিহত শফিকুল ইসলামের পরিবারে নেমে এসেছে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী রুমা খাতুন এবং দুই কন্যাসন্তানকে রেখে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বড় মেয়ে মৌ আক্তার স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী।

প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, শফিকুলের আয়ের ওপরই পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল। তার মৃত্যুর ফলে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দুই মেয়ের লেখাপড়া ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সরকারি সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, খুলনার সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান জানান, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই দাফন-কাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ৩ লাখ টাকা এবং জীবন বীমা বাবদ ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। ফলে নিহত দুই প্রবাসী ও হামলায় আহত আরেক প্রবাসীর পরিবার নিয়ম অনুযায়ী, মোট ১৩ লাখ টাকা করে সহায়তা পাবে। তবে অর্থের অঙ্ক কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনতে পারবে না হারিয়ে যাওয়া দু’টি প্রাণ। পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ আর স্বজনদের অপেক্ষা রেখে দুই প্রবাসীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকাহত সাতক্ষীরাবাসী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধার কফিনবন্দি প্রত্যাবর্তন নতুন করে মনে করিয়ে দিলো প্রবাস জীবনের নির্মমতা।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন