আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। বাজেটকে ঘিরে যখন রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন নীতিনির্ধারক ও শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের মতে, এলডিসি উত্তরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক শ্রমবাজারের বাস্তবতায় শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। শিক্ষা খাতকে ব্যয় নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার এখনই উপযুক্ত সময়।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেন, আগামী দিনের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে। ফলে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তার মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি তৈরি ছাড়া বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, উচ্চশিক্ষাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শুধু সনদ প্রদান নয়, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তার মতে, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পখাত অংশীদারিত্ব জোরদার করা জরুরি।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাত অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সেই কারণেই আমি মনে করি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষা। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নয়, বরং একটি সমন্বিত মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে পুনর্নির্ধারণ করবে। এ কারণে সিএসইআর এর বাজেট প্রস্তাবনায় শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বর্তমান প্রায় ৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে এআই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী চিকিৎসা শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে অধিকতর একাডেমিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের আওতায় এনে গবেষণাভিত্তিক অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ করতে হবে। কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন, স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে মেডিকেল শিক্ষা ও গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও গবেষণা ও উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি উঠেছে।
সিএসইআরের আরও যেসব প্রস্তাব
সাকিফ শামীম আরও বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমরা সাধারণত কয়েকটি পরিচিত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। রাজস্ব আয় কত হবে, মূল্যস্ফীতি কতটা কমবে, কোন খাতে কত বরাদ্দ বাড়বে, নতুন কর আরোপ হবে কি না কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কী ধরনের প্রণোদনা আসবে-এসব প্রশ্নই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাজেট নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত অন্য। প্রশ্নটি হলো- আমরা কি এমন একটি অর্থনীতি নির্মাণ করছি, যা আগামী বিশ বছর টিকে থাকতে পারবে?
বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের সময় অতিক্রম করছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, পরিবর্তিত শ্রমবাজার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা আমাদের সামনে একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় উন্নয়নের পুরোনো সূত্রগুলো আর যথেষ্ট নয়। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ, কেবল শিল্পায়ন কিংবা কেবল রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী দিনের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হবে মূলত জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি-সক্ষম মানব সম্পদকে ঘিরে। সেই কারণেই আমি মনে করি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষা। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নয়, বরং একটি সমন্বিত মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে পুনর্নির্ধারণ করবে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিক্ষা খাতে আমাদের সরকারি ব্যয় এখনও জিডিপির তুলনায় অনেক কম। ইউনেস্কো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বিনিয়োগের সুপারিশ করে আসছে। কিন্তু আমরা এখনও সেই মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করি? যদি করি, তাহলে বাজেট কাঠামোতে তার প্রতিফলন আরও সুস্পষ্ট হওয়া উচিত।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশে উন্নীত করার একটি জাতীয় রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত। এটি হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
শিক্ষার ভিত্তি নির্মিত হয় প্রাথমিক পর্যায়ে। একটি শিশুর শেখার ক্ষমতা, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তি তৈরি হয় এই স্তরে। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার সন্তোষজনক হলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ এখনও রয়ে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পরও মৌলিক ভাষা ও গণিত দক্ষতায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দের একটি বড় অংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল লার্নিং, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী এবং শিক্ষার ফলাফল মূল্যায়ন ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় করা প্রয়োজন। শুধু বিদ্যালয় নির্মাণ করলেই হবে না, শিক্ষার মানোন্নয়নকেই বাজেট বরাদ্দের মূল লক্ষ্য হতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা এমন একটি পর্যায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে পরীক্ষাভিত্তিক এবং মুখস্থনির্ভর। বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তি ব্যবহার, উদ্যোক্তা মনোভাব কিংবা সৃজনশীল চিন্তার বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা যায়নি। অথচ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে এসব দক্ষতাই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠছে।
জাতীয় বাজেটে তাই মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে বিজ্ঞানাগার উন্নয়ন, প্রযুক্তি শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ব্যবস্থার জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকা উচিত। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ তৈরি না করতে পারলে শিক্ষিত বেকারত্ব আরও বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর ) তাদের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায় শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এলডিসি-উত্তর বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে শিক্ষা খাতে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার।
সিএসইআর এর প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:-
শিক্ষা খাতের মোট বরাদ্দ বর্তমান ৯৫,৬৪৪ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে কমপক্ষে ১,১৫,০০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে এআই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ চালু এবং শিক্ষকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা-এর বাজেট কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে শিল্পখাতের দক্ষ জনবল সংকট দূর করা।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিকে বাজেট পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। এ ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায়।
আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম শর্ত হলো দক্ষ জনশক্তি। জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো তাদের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে কারিগরি শিক্ষাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে একদিকে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প ও উৎপাদন খাত দক্ষ কর্মীর সংকটে ভুগছে। এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য। আমার মতে, আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি আন্তর্জাতিক মানের ভোকেশনাল ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, অটোমেশন, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি প্রযুক্তি, নির্মাণশিল্প এবং মেরিটাইম খাতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
জাতীয় বাজেটে মোট শিক্ষা বরাদ্দের অন্তত ১৫ শতাংশ কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও শিল্প প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করার জন্য কর-প্রণোদনা এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেল চালু করা প্রয়োজন।
মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল বিষয় সামনে আসে, তা হলো এর ব্যবস্থাপনা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস। এখানে “প্রাইভেটাইজেশন” শব্দটি সরাসরি বাণিজ্যিক মালিকানা হস্তান্তরের অর্থে নয়, বরং প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষতা-ভিত্তিক পরিচালনার একটি নতুন মডেল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংস্কার জরুরি। আজকের বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কতজন গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে নির্নয় করা যাবে না; বরং কতটুকু গবেষণা হচ্ছে, কতগুলো উদ্ভাবন তৈরি হচ্ছে এবং কতজন উদ্যোক্তা গড়ে উঠছে তার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত অংশীদারিত্ব, গবেষণা অনুদান এবং স্টার্টআপ ইনকিউবেশন কার্যক্রমের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা উচিত।
জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। এসব দেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ভাষায় দক্ষতা অপরিহার্য। ভাষা শিক্ষাকে তাই কেবলমাত্র একটি একাডেমিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা না করে একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
আজ যে তরুণ ভাষা শিখে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে, আগামীকাল সেই তরুণ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। একইভাবে ভাষাগতভাবে দক্ষ কর্মীরা উচ্চ আয়ের চাকরিতে প্রবেশ করে দেশের জন্য অধিক রেমিট্যান্স অর্জন করতে সক্ষম হবে। ফলে ভাষা শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি এবং রেমিট্যান্স অর্থনীতির মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে রেমিট্যান্স আয়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়, তাহলে ভাষা শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক দক্ষতা উন্নয়নকে জাতীয় নীতির অংশ করতে হবে। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আন্তর্জাতিক মানের ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, আন্তর্জাতিক ভাষা পরীক্ষার প্রস্তুতি সহায়তা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান প্রস্তুতি কার্যক্রম চালুর জন্য বাজেটে পৃথক বরাদ্দ রাখা উচিত। “জাতীয় ভাষা ও বৈশ্বিক দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল” গঠন করে এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ, যেখানে সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষ মানবসম্পদ। তাই ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে শিক্ষা খাতকে একটি ব্যয় খাত হিসেবে বিবেচনা করার পাশাপাশি, জাতীয় উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী বিনিয়োগ হিসেবে ও বিবেচনা করার সময় এসেছে।
কারণ আজকের শ্রেণিকক্ষেই গড়ে উঠছে আগামী দিনের বাংলাদেশ। আর আজকের শিক্ষা বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে আমাদের জাতীয় প্রতিযোগিতাশক্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধি। শিক্ষা খাতে সঠিক বিনিয়োগই হতে পারে ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
