কৃষি পুনর্গঠন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়ার আহ্বান

‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ গোলটেবিল আলোচনা

কৃষি পুনর্গঠন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়ার আহ্বান

ফন্ট সাইজ:

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতের পুনর্গঠন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনলাইন প্লাটফর্ম চরচা আয়োজিত ‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

তারা বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কৃষি ও শিল্পে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর ও প্রশাসনিক সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।

আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।

গোলটেবিল আলোচনায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ, এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর, গবেষক ও অধিকারকর্মী মাহা মির্জা, সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, আইসিএমএবি সভাপতি কাউসার আলম, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম। সঞ্চালনা করেন চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসান।

আলোচনায় নতুন অর্থনৈতিক মডেলের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকার একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে কাজ করছে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা।’

তিনি বলেন, ‘‘সরকারের দর্শন হলো ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দেশীয় ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে।’

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনর্গঠন প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছে।’ একই সঙ্গে কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং তৃণমূল পর্যায়ে সেবার সম্প্রসারণের ওপরও জোর দেন তিনি।

এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘বেসরকারি খাতের বিকাশ ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কর কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমান ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ করপোরেট কর কমিয়ে ভিয়েতনামের মতো ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নীতির অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে। তাই অন্তত তিন বছরের জন্য স্থিতিশীল কর নীতি নিশ্চিত করা জরুরি।’

নাসিম মঞ্জুর বিমানবন্দরের গুদাম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সমালোচনা করে বলেন, ‘আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে প্রতি বছর কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল ও পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ তিনি কর প্রশাসনে ডিজিটাল ও ঝুঁকিভিত্তিক (রিস্ক-বেসড) অডিট ব্যবস্থা চালুরও দাবি জানান।

গবেষক ও অধিকারকর্মী মাহা মির্জা বলেন, ‘দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি হওয়া সত্ত্বেও কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি।’ তিনি কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ বর্তমান ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার দাবি জানান।

তিনি বলেন, ২০২৬ সালেও কৃষকদের ধান শুকানোর জন্য রোদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কৃষকের দোরগোড়ায় সুলভ মূল্যে ক্রপ ড্রায়ার, কম্বাইন হারভেস্টারসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্র পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মাহা মির্জা অভিযোগ করেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে কৃষি প্রণোদনা ও যান্ত্রিকীকরণের সুবিধা প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে চলে যায়। তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় অনেক কৃষক বছরের বড় একটি সময় কর্মহীন থাকেন এবং জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হতে বাধ্য হন।’

আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটকে বাস্তবমুখী ও সংস্কারমুখী হতে হবে। তারা কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। বক্তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক সংস্কার, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের সমন্বিত উদ্যোগই বাংলাদেশকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন