মুখরোচক পান বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সেই পানের স্বাদ-গন্ধ, ঠোঁট-জিহ্বার টুকটুকে লাল আভা আর ম-ম সুবাসের অপরিহার্য উপাদান ছিল ঝিনুক পোড়ানো ঐতিহ্যবাহী ‘জুগির চুন’। এক সময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে, খিলি পানের দোকানে, এমনকি ঐতিহাসিক স্থাপনায়ও যার ছিল কদর ও জৌলুস। কিন্তু আধুনিক পাথরচুন ও রাসায়নিক চুনের ভিড়ে আজ বিলীন হতে বসেছে আদি বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতির এই প্রাচীন শিল্প। জানা গেছে, চুন তৈরির সঙ্গে জড়িত সমপ্রদায়টি ‘জুগি’ নামে পরিচিত। তাদের বসবাসের গ্রামগুলো পরিচিত ছিল ‘জুগিপাড়া’ নামে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে বিশেষ পদ্ধতিতে কোঠায় পুড়িয়ে চুন তৈরি করতেন তারা। পুরুষেরা মাটির হাঁড়িতে চুন বোঝাই করে এবং নারীরা ডালি মাথায় নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করতেন। তাদের পরিচিত হাঁক ছিল-‘চুন লাগবে নাকি জুগির চুন।’ এই ঝিনুক পোড়ানো চুন শুধু পানের স্বাদ বাড়াতো না; ছিল ভেষজ গুণসম্পন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব। গ্রামীণ অফিস-আদালত, মসজিদ-মন্দির, পাকা-আধাপাকা বাড়ি নির্মাণ এবং গাছের গোড়ার সৌন্দর্যবর্ধনেও এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। প্রাচীন বাংলার মসজিদ, মন্দির ও জমিদার বাড়ি নির্মাণেও জুগির চুন ও সুরকির ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে এ শিল্পের ওপর নির্ভর করেই বহু পরিবার সচ্ছলভাবে জীবিকা নির্বাহ করতো। সরজমিন কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কেশবা জুগিপাড়া ও চাঁদখানা ইউনিয়নের নগরবন জুগিপাড়া গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, আগের সেই ব্যস্ততা আর নেই। শত শত পরিবারের চুলায় এখন আর ঝিনুক পোড়ানো হয় না। জলবায়ু পরিবর্তন, জলাশয় ভরাট, অবাধ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারসহ নানা কারণে ঝিনুকের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও সহজলভ্য পাথরচুন বাজার দখল করায় এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়েছেন অধিকাংশ মানুষ। চাঁদখানা নগরবন জুগিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা দীনেশ চন্দ্র দেবনাথ জানান- আগে আমাদের তৈরি ঝিনুক পোড়ানো চুনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন স্থানীয়ভাবে ঝিনুক না পাওয়ায় দিনাজপুর থেকে কিনে এনে চুন তৈরি করি। গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। কোনোমতে সংসার চলে। কেশবা জুগিপাড়ার খোকা দেবনাথ বলেন- জুগির চুন শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, বিবাহ, পূজা-পার্বণেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লোকবিশ্বাসে এটি শুদ্ধতা ও মঙ্গলের প্রতীক। আয়ুর্বেদ ও লোকচিকিৎসায়ও এর ব্যবহার ছিল। এখন সেই ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। প্রবীণদের মতে, জুগির চুন শুধু একটি শিল্প নয়, এটি শতবর্ষী কারিগরি জ্ঞান ও সংস্কৃতির অংশ। আধুনিক পাথরচুনে অতিরিক্ত ক্ষারত্ব ও ভেজালের কারণে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। অথচ ঐতিহ্যবাহী ঝিনুক পোড়ানো চুন ছিল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।
বিলীনের পথে বাঙালি ঐতিহ্যের ঝিনুক পোড়ানো ‘জুগির চুন’
কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) প্রতিনিধি
২১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
