চীন স্থানীয়ভাবে নির্মিত মাইক্রো ড্রামাগুলোতে ভোগবাদ, সহিংসতা এবং যৌন আবেদননির্ভর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে। চীনের ন্যাশনাল রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো এমন কনটেন্ট দমন করা, যেখানে সফট পর্নোগ্রাফি, বিবাহ ও সম্পর্ক বিষয়ে বিকৃত ধারণা এবং জাঁকজমকপূর্ণ সম্পদ প্রদর্শন তুলে ধরা হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
এ উদ্যোগ চীনা সরকারের বৃহত্তর সামাজিক নীতি কর্মসূচির অংশ। এর মাধ্যমে সরকার সামাজিক মূল্যবোধকে প্রভাবিত করতে, বিয়েকে উৎসাহিত করতে এবং অনলাইনে ক্ষতিকর মতাদর্শের বিস্তার ঠেকাতে চায়। মাইক্রো ড্রামা হলো মোবাইল ফোনকেন্দ্রিক ছোট ছোট ধারাবাহিক ভিডিও, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে অতিরঞ্জিত ও চটকদার কাহিনির কারণে এগুলো সমালোচনারও মুখে পড়েছে। অনেক মাইক্রো ড্রামায় দ্রুতগতির নাটকীয় কাহিনি দেখা যায়। বিষয়বস্তুর মধ্যে থাকে গোপন ধনকুবের স্বামী, নিষিদ্ধ প্রেম কিংবা নানা চমকপ্রদ সম্পর্কের গল্প, যা দর্শকদের দীর্ঘ সময় পর্দার সঙ্গে আটকে রাখার জন্য তৈরি করা হয়।
এ ছাড়া অতিরিক্ত সহিংসতা বা যৌন আবেদননির্ভর চরিত্র উপস্থাপনকারী নাটকের সংখ্যাও কম নয়। চীনের গণমাধ্যম প্রশাসন চলতি সপ্তাহে এক বিবৃতিতে বলেছে, মাইক্রো ড্রামা শিল্পে একটি সুস্থ কনটেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে এই অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযানে যেসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে, তার মধ্যে রয়েছে সফট পর্নোগ্রাফি, ভোগবাদ ও জাঁকজমকপূর্ণ সম্পদ প্রদর্শন এবং বিবাহ ও সম্পর্ক নিয়ে বিকৃত ধারণা। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সামন্তবাদী বিষয়বস্তু, সহিংস প্রতিশোধমূলক কাহিনি, অশালীন শিরোনাম এবং কপিরাইট লঙ্ঘন নিয়েও ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নিজ নিজ এলাকার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ওপর আকস্মিক পরিদর্শন চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোনো সমস্যা ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত তা সংশোধন করতে হবে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, তারা নিজেরাও পরিদর্শন চালাবে এবং অভিযানের ফলাফলের ভিত্তিতে বিদ্যমান নীতিমালা আরও শক্তিশালী করবে।
বহুবিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে মাইক্রো ড্রামা
চীনে মাইক্রো ড্রামা এখন বহুবিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। শুধু চীনেই নয়, এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও এসব কনটেন্টের বিশাল দর্শকশ্রেণি তৈরি হয়েছে। এই দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে অংশ নিতে দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযোজকরাও নিজেদের মাইক্রো ড্রামা স্টুডিও গড়ে তুলেছেন। গত বছর এই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে চীনা সরকার নির্দেশ দেয় যে, গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মাইক্রো ড্রামা নির্মাণের আগে সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। চীনের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম উইচ্যাট এবং দৌইন-ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্টের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। একই সঙ্গে তারা এমন মাইক্রো ড্রামার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়, যেগুলো কিশোরদের অসদাচরণ, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া (ভিজিলান্টিজম) কিংবা অতিরিক্ত ভোগবাদকে উৎসাহিত করে।
সামাজিক মূল্যবোধে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর নেতৃত্বে বেইজিং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমাজের মূল্যবোধ ও আচরণে প্রভাব বিস্তারের জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুস্থ সম্পর্ককে উৎসাহ দেয়া এবং সম্পদের প্রকাশ্য প্রদর্শনকে নিরুৎসাহিত করা। এ উদ্যোগ এমন সময়ে নেয়া হচ্ছে, যখন দেশটি বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। শি দীর্ঘদিন ধরে কমন প্রসপারিটি বা সবার জন্য সমৃদ্ধি নীতির পক্ষে কথা বলে আসছেন। এর লক্ষ্য হলো চীনে ক্রমবর্ধমান ধনী-গরিব বৈষম্য কমিয়ে আনা, যা দেশটির একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু।
অন্যদিকে, চীনের সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব চায়না আলাদাভাবে দুই মাসব্যাপী একটি অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানে এমন অনলাইন কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, যেগুলো নৈরাশ্যবাদী অনুভূতি অতিরিক্তভাবে ছড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে এমন বক্তব্যকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যেখানে জীবনের প্রতি বিরক্তি, হতাশা বা কঠোর পরিশ্রম করে কোনো লাভ নেই ধরনের ধারণা প্রচার করা হয়।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য হলো আরও সভ্য ও যুক্তিনির্ভর অনলাইন পরিবেশ গড়ে তোলা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন বেকারত্ব, চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক মন্থরতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। এসব কারণে দেশটির অনেক তরুণের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
