ইতিহাস খুব কমই কোনো জাতিকে একই সঙ্গে সুযোগ, বৈধতা এবং দায়িত্ব দেয়। বাংলাদেশ আজ সেই বিরল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। তবে এই সাফল্যকে শুধু একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদ লাভ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি, একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
প্রায় ২০০ কোটি মানুষের আবাসভূমি দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল। জনসংখ্যা, অর্থনীতি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং কৌশলগত গুরুত্ব সব বিবেচনায় এই অঞ্চলের বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক বিভক্তি এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের অভাবে দক্ষিণ এশিয়া এখনো একটি কার্যকর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর গড়ে তুলতে পারেনি।
১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার সময় যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, চার দশক পর তা অনেকটাই স্তব্ধ। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান কিংবা আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, বৈশ্বিক ঋণসংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক অভিঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে কথা বলার জন্য একটি শক্তিশালী কণ্ঠের প্রয়োজন। বাংলাদেশ সেই ভূমিকা পালন করতে পারলে শুধু নিজের নয়, পুরো গ্লোবাল সাউথের স্বার্থকেও সামনে নিয়ে যেতে পারবে।
বিশেষ করে জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (Loss and Damage Fund), ঋণ পুনর্গঠন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ কার্যকর আন্তর্জাতিক আলোচনা এগিয়ে নিতে পারে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এবং নৈতিক অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।
তবে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা সংকট। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ধীরে ধীরে কমছে, দাতা দেশগুলোর আগ্রহও আগের মতো নেই। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসন থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার সুযোগ পাবে। সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক উদাসীনতা ভাঙার জন্য এটি একটি বিরল কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখা। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক সায়মা ওয়াজেদকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তার নির্বাচনী প্রচারণা, যোগ্যতা ও তথ্য উপস্থাপন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরবর্তীতে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠানো এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে দায়িত্ব পরিচালনার ঘটনা বিশ্বমঞ্চে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে।
এই ঘটনাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিতর্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব অর্জনের জন্য শুধু রাজনৈতিক সমর্থন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পেশাগত দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা। বাংলাদেশ যদি জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের আসনকে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে চায়, তবে তাকে বিশ্বকে দেখাতে হবে যে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতেই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতাও বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পারস্পরিক টানাপোড়েনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ কাজ নয়। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”এখন বাস্তব পরীক্ষার মুখে। গাজা, ইউক্রেন ও মিয়ানমার ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অবস্থানই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়াবে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই বিজয়কে শুধু বাংলাদেশের অর্জন হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য ছোট করে দেখা হবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটি সুযোগ। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, সমুদ্র অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোতে নতুন ধরনের সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তোলার সময় এসেছে। সার্ক আজ কার্যত নিষ্ক্রিয় হলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নতুন বাস্তবতায় আঞ্চলিক সহযোগিতার পথ খুঁজতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষী, বৈশ্বিক সংকটের মুহূর্তে যে দেশ নেতৃত্বের সাহস দেখায়, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক আলোচনায় তার প্রভাবও বাড়ে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের জন্য সেই বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এটিকে কেবল একটি সম্মানজনক পদ হিসেবে দেখব, নাকি এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ গঠনের একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করতে পারব?
আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু হারানো অত্যন্ত সহজ। তাই বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু নেতৃত্ব দেওয়ার নয়, নেতৃত্বের নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠারও চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব আজ বাংলাদেশের কাছ থেকে কেবল কূটনৈতিক দক্ষতা নয়, নীতিগত দৃঢ়তা, স্বচ্ছতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বও প্রত্যাশা করছে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
