ফুটবলের ইতিহাসে নির্দিষ্ট কিছু পজিশন যেন একেকটি দেশের ট্রেডমার্ক। ব্রাজিলের সৈকতে যেমন গড়ে ওঠে রবার্তো কার্লোস, কাফু, মার্সেলোদের মতো বিশ্বসেরা ফুল-ব্যাক। ইতালির রক্ষণাত্মক কৌশলের চুল্লিতে পোড় খেয়ে তৈরি হয় ফ্রাঙ্কো বারেসি, ফ্যাবিও কানেভারোর মতো সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার, আর আর্জেন্টিনার গলিতে জন্ম নেয় দিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির মতো জাদুকরী ‘নাম্বার টেন’। ২০১০ সালে এক সোনালী প্রজন্মের হাত ধরে বিশ্বজয়ের পর থেকে স্পেনের ফুটবলীয় পরিচয় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে তেমনই একটি পজিশনের সঙ্গে- সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার।
জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাবি আলোনসো, সার্জিও বুসকেটস, সেস ফ্যাব্রিগাস কিংবা থিয়াগো আলকানতারাদের হাত ধরে যে জয়যাত্রার শুরু হয়, ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চেও স্পেনের সেই ‘মিডফিল্ড সাপ্লাই লাইন’ ফুরিয়ে যায়নি। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী স্পেনের বর্তমান প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাতে এখন রদ্রি, পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইসের মতো একঝাঁক বিশ্বমানের ফুটবলার। তবে স্পেন কীভাবে বছরের পর বছর এমন বুদ্ধিদীপ্ত মিডফিল্ডার তৈরি করে চলেছে?
এর নেপথ্যের গল্প শোনা যায় স্থানীয় ফুটবল সংশ্লিষ্টদের থেকে। বার্সেলোনার একাডেমির সাবেক এবং বর্তমান তুলুজের কোচ কার্লেস মার্টিনেজের মতে, রদ্রিদের মতো বিশ্বসেরা মিডফিল্ড লাইন তৈরির পেছনে কোনো একক ক্লাবের কৃতিত্ব নেই, বরং রয়েছে পুরো স্প্যানিশ ফুটবলের একটি অভিন্ন দর্শন। তিনি বলেন, “স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের, বিশেষ করে মিডফিল্ডারদের মধ্যে আমি যে পার্থক্যটা দেখি, তা হলো খেলাটির প্রতি তাদের গভীর উপলব্ধি। স্পেনে অনুশীলনের সময় সবসময় ‘কেন’ শব্দটির ওপর জোর দেয়া হয়্ত তুমি যদি এই পাসটা দাও, তবে তার ফলাফল কী হবে, এরপর কী ঘটবে। যখন একজন খেলোয়াড় যদি কোনো পাসের পেছনের কারণটা বোঝে, তখন তার খেলা অন্য স্তরে পৌঁছে যায়।” তবে এই দর্শনে টেকনিক এবং ট্যাকটিকসকে আলাদা করে দেখা হয় না। মার্টিনেজের মতে মূল মন্ত্র হলো্ত বল পায়ে আসার আগেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করে ফেলা।
তিনি আরও বলেন, ‘যে দ্রুত চিন্তা করতে পারে না, দ্রুত খেলতে পারে না কিংবা ফাঁকায় থাকা সতীর্থকে খুঁজে পায় না, সে স্প্যানিশ ফুটবল সিস্টেমে টিকতে পারে না। দলগুলোর পরিবর্তন ঘটে, খেলোয়াড়রা আসে-যায়, তবে স্পেনের খেলার মূল কাঠামোটা একই থাকে।’ স্পেনের বয়সভিত্তিক জাতীয় দলগুলোর সাবেক সমন্বয়ক টিতো ব্লাঙ্কোও এই একই দর্শনের কথা উল্লেখ করেন। ব্লাঙ্কোর মতে, স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ৪-৩-৩ ফর্মেশনের মূল চালিকাশক্তি হলো মিডফিল্ড। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা। ব্লাঙ্কো বলেন, ‘আমরা সবসময় বল পজিশন ধরে রাখতে চাই, সুযোগ তৈরি করতে চাই এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বল রাখতে চাই। কারণ, বল যত বেশি সময় আপনার পায়ে থাকবে, প্রতিপক্ষ আপনাকে তত কম আঘাত করার সুযোগ পাবে।’
এই মিডফিল্ড সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর দূরদর্শিতা। স্প্যানিশ ফুটবলে একজন মিডফিল্ডারকে কেবল আক্রমণভাগের জোগানদার হিসেবে ভাবা হয় না। বরং তাকে পুরো দলের ‘ইঞ্জিন’ ও ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে তৈরি করা হয়। বল যখন নিজেদের পায়ে থাকে, তখনও প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ রুখতে মাঝমাঠের ফুটবলারদের সদা সতর্ক থাকতে হয়। এই আধুনিক ঘরানার ফুটবল কৌশল রপ্ত করেই স্পেনের যুব দল থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২১ এবং মূল দল-সবখানেই একই ছন্দে আলো ছড়াচ্ছেন ফুটবলাররা।
টিতো ব্লাঙ্কোর মতে, মাঠের পজিশন অনুযায়ী ফুটবলারদের টেকনিক্যাল দক্ষতার পাশাপাশি তাদের মানসিক বা ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটানোই স্পেনের মূল রহস্য। আর মার্টিনেজের কথায় বোঝা গেল, বল রিসিভ করার আগেই চারপাশের পুরো ছবিটা যারা মাথায় গেঁথে নিতে পারেন, তারাই স্পেনের এই ‘ফ্যাক্টরি’ থেকে বিশ্বমঞ্চ কাঁপাতে বেরিয়ে আসেন। আসন্ন বিশ্বকাপে বিশ্বসেরার মুকুট পুনরুদ্ধার করতে অনুমিতভাবেই কোচ দে লা ফুয়েন্তের ট্রাম্পকার্ড আবারও হতে যাচ্ছে স্পেনের এই মাঝমাঠের জাদুকররাই।
বর্তমানে রদ্রি, পেদ্রি, জুবিমেন্দি, গাভি ও বায়েনার মতো একঝাঁক তারকা নিয়ে এক মধুর সমস্যাতেই আছেন স্প্যানিশ কোচ দে লা ফুয়েন্তে। বিশ্বমঞ্চে কাকে রেখে কাকে জায়গা দেবেন, তা ঠিক করতে মূল পর্বের আগে দুটি ম্যাচের সুযোগ পাবেন তিনি। আগামী ৪ঠা জুন ইরাকের বিপক্ষে ঘরের মাঠে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলে বিশ্বকাপের বিমান ধরবে লা রোজারা। শেষ প্রস্তুতি হিসেবে মেক্সিকোতে পেরুর বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মিডফিল্ডার তৈরির এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ কর্তে স্পেনের ফুটবল কোনো সাময়িক জোয়ার নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী ও নিখুঁত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
