পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের তিন সপ্তাহ পর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে জনরোষের মুখে নিগৃহীত হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের দুই সাংসদ। তবে এই ঘটনা তৃণমূল কংগ্রেসকে এই কঠিন সময়ে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ঠিক ৩৫ বছর আগে তৎকালীন কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাথায় বামকর্মীদের আঘাতের ফলে সংকটাপন্ন হয়েছিলেন। তখন সেই ঘটনাটি এককভাবে একজন পথযোদ্ধা হিসেবে তার ভাবমূর্তিকে দৃঢ় করেছিল।
শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগণার সোনারপুরে ভোট পরবর্তী হিংসায় মৃত এক দলীয় কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সবর্ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন। তাকে ঘিরে ধরে বিক্ষুব্ধ জনতা জামা ধরে টানাটানি, কিল-চড় থেকে শুরু করে ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ জানান তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অপশাসনের। এর ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জনরোষের মুখে আক্রান্ত হয়েছেন লোকসভার তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলনেতা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রোববার সকালে নিজের নির্বাচনী এলাকাতে বিক্ষুব্ধ জনতার রোষের মুখে পড়েন তিনি। হুগলির চণ্ডীতলার কাছে তিনি আক্রমণের শিকার হন।
তার মাথায় এসে লাগে একটি ক্রিকেট বল বা বড় পাথরের টুকরো। এরপর তিনি মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে পড়ে যান। দু’টি ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে জনতা কালো পতাকা দেখিয়ে চোর চোর স্লোগান দিয়েছে। শারীরিক হেনস্তা করেছেন বিক্ষোভকারী জনতা। তবে তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা কোনো ধরনের জনরোষের কথা নাকচ করে দিয়েছেন। তারা বিশেষভাবে বিজেপিকে লক্ষ্য করে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এসব প্রতিশোধমূলক হামলা। অভিষেক অভিযোগ করেছেন, তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। তাকে ক্রিকেটের হেলমেট পরিয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করেন। সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার উপরে হামলার জন্য বিজেপিকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, এটা কোনো গণরোষ নয়। বিজেপি কর্মীরা আমাদের লোকদের মারধর করছিল। এখন তারা আমাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এই হামলার জন্য তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে দায়ী করেছে, কিন্তু বিজেপি কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে। তবে সোনারপুরে অভিষেকের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা থেকে শুরু করে পৌরসভা প্রধান এবং কাউন্সিলর পর্যন্ত পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে।
একসময় দলটিকে ঘিরে থাকা অপরাজেয়তার আবহ ভেঙে গেছে, যা পশ্চিমবঙ্গে দলটির নিকট ভবিষ্যৎ এবং জাতীয় মঞ্চে মমতার প্রভাব-উভয় বিষয় নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, জনরোষের নামে শীর্ষ নেতাদের ওপর হামলার ঘটনা তৃণমূল কংগ্রেসকে উঠে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিতই করবে। ইতিমধ্যেই এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে সমর্থন আসতে শুরু করেছে। কংগ্রেস নেতাদের কাছ থেকেই সবচেয়ে জোরালো সমর্থন এসেছে। এই সংহতি প্রদর্শনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি এই হামলাকে ‘অত্যন্ত নিন্দনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এটিকে শুধু সংসদ সদস্যের ওপর নয়, বরং গণতন্ত্রের ওপরই আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালও এই ধরনের আক্রমণের তীব্র নিন্দা করেছেন।
