ফ্রান্সে বৈধ অভিবাসন তিন বছরের জন্য স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। তার এই বক্তব্য ঘিরে ফ্রান্সজুড়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ফরাসি সাপ্তাহিক ‘ল্য ঝুরনাল দ্যু দিমঁশ’-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দারমানাঁ বলেন, ফ্রান্স বর্তমানে অভিবাসীদের একীভূত করার সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গেছে। তার ভাষায়, ফরাসি জনগণ নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন আর চায় না। রাষ্ট্রকে এখন কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
তিনি প্রস্তাব করেন, আগামী তিন বছরের জন্য বৈধ অভিবাসন স্থগিত রেখে ফ্রান্সে নতুন অভিবাসন নীতি প্রণয়ন করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি কানাডার আদলে নির্দিষ্ট সংখ্যাভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা চালুর কথাও বলেন, যাতে প্রতি বছর সীমিত সংখ্যক অভিবাসী গ্রহণ করা হয়।
দারমানাঁর মতে, বর্তমান সংবিধান ও ইউরোপীয় আইনের কাঠামোর কারণে ফরাসি সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট ক্ষমতা পাচ্ছে না। তিনি বলেন, যদি ফরাসিরা সীমিত অভিবাসন চায়, তাহলে সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
সাক্ষাৎকারে তিনি পারিবারিক পুনর্মিলন নীতিতেও কড়াকড়ির পক্ষে মত দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কাজের উদ্দেশ্যে ফ্রান্সে আসা বিদেশি নাগরিকদের পরিবারকে সহজে নিয়ে আসার সুযোগ সীমিত করা হতে পারে।
বিচারমন্ত্রী অভিবাসন প্রশ্নকে সরাসরি নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সহিংসতা, মাদক চক্র এবং কিছু শহরতলির অস্থিরতার পেছনে ব্যর্থ অভিবাসন নীতির প্রভাব রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত বিচার, বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কার এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন।
আলোচনায় উঠে আসে আলজেরিয়ার বিষয়ও। ফ্রান্স যেসব আলজেরীয় নাগরিককে বহিষ্কার করতে চায়, তাদের ফিরিয়ে নিতে আলজিয়ার্সের অনীহা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দারমানাঁ। তিনি বলেন, যে দেশ নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করবে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে ভাবতে হবে।
দারমানাঁর এই অবস্থানকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বামপন্থী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, সরকার ধীরে ধীরে কট্টর ডানপন্থী ভাষা ও নীতি গ্রহণ করছে। অন্যদিকে রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা তার বক্তব্যকে বাস্তবসম্মত বলে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখেই অভিবাসন ও নিরাপত্তা প্রশ্নকে নতুনভাবে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আনা হচ্ছে। যদিও দারমানাঁ এখনো প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দেননি, তার সাম্প্রতিক অবস্থানকে অনেকেই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন।
বর্তমানে ফ্রান্সে অভিবাসন শুধু প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, এটি জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন জেরাল্ড দারমানাঁ।
