ইশতেহারের বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান নাগরিক প্ল্যাটফরমের

ফন্ট সাইজ:

নতুন সরকারকে নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে একটি সুসংহত মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে নাগরিক প্ল্যাটফরম। পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিদেশি ঋণের চাপ আগামী সময়ে আরও বাড়বে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া ট্যাক্স জিডিপি রেশিও ১৫ শতাংশে না গেলে এ সরকারের অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে পড়বে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার-এ এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু; অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’- শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ সব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন- সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- সিপিডি’র বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও মোস্তাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠান আয়োজন করে নাগরিক প্ল্যাটফরম।
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম জানায়, নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে আবেগ নয় বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। এজন্য একটি সুসংহত মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তার সঙ্গে বাজেট ও সংস্কার কর্মসূচির সমন্বয় ঘটাতে হবে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও তা অর্জনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত না করলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক তৈরি হবে।
প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আসন্ন ২০২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবসম্মত জাতীয় বাজেট কাঠামো প্রস্তুত করতে হবে। এতে রাজস্ব আহরণ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর শৃঙ্খলা আরোপের পাশাপাশি অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে ব্যয় পুনর্বিন্যাস জরুরি। বিদ্যমান বাজেট বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন না করলে আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে। তিনি বলেন, অর্থনীতির ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতা এবং সংকুচিত রাজস্ব পরিসর-এই তিন বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সরকারকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোতে হবে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডি’র অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে অর্থনীতি একটি বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকার সেই সংকটকালে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখানে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক, সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দুই, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি একটি নির্ভরযোগ্য অবস্থানে নেই। তিন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে অনেক সীমাবদ্ধ। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের প্রথম কাজ হবে ২০২৪ সালের বাজেট সংশোধন করা। এ সংশোধনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো প্রস্তুত করা। এরপর ধীরে ধীরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে এগোনো। তবে তা অবশ্যই আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে করা উচিত।
নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসাবে ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখছে নাগরিক প্ল্যাটফরম। একই সঙ্গে কার্ড নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
যার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, গ্রামীণ পাঁচ মিলিয়ন পরিবারকে মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ মিলিয়ন পরিবারকে এ সহায়তার আওতায় আনতে বছরে আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, যা জিডিপি’র প্রায় ০.১৫ থেকে ০.২০ শতাংশের সমান। এই কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সমপ্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে সর্বজনীন মৌলিক আয় বাস্তবায়নের একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করতে পারে। তবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। এর পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রচলিত প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত অন্তর্বর্তী সরকার যেসব ক্রয় চুক্তি করে গেছে, সেখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন। গত সরকার বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক চুক্তিও করেছে। এ সব বৈদেশিক চুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়নি বা শুধু বন্দর দিয়ে দেয়ার জন্য হয়নি। অন্যান্য ক্ষেত্রেও হয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে হয়তো আমরা এখনো অবহিত না। এ সব বৈদেশিক চুক্তিকে পুনর্বিবেচনা করা উচিত। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ পরিস্থিতি যেভাবে পেয়েছিল, তার চেয়েও আরও নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে। নতুন সরকারের টাকা ছাপানোর চিন্তা স্বপ্নেও করা ঠিক হবে না। ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা চলতি অর্থবছরে না করা ভালো। বর্তমান সরকারকে আইনের শাসন প্রমাণ করতে হবে এবং সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। দেবপ্রিয় বলেন, ‘বলা হচ্ছে, ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোবে। তবে আমি সরকারের যেকোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করার বিপক্ষে। আমি ধৈর্য ধরতে বলবো। চলতি অর্থবছরে নতুন কিছু না করে; বরং পরবর্তী অর্থবছরের জন্য যথাযথভাবে পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংযম দেখালে আগামী অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্য অসুবিধাগুলো পরিষ্কারভাবে উতরে যাবে।’ তিনি বলেন, সরকারের এ মুহূর্তে কোনো জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নেই। সরকারকে অবশ্যই বাজেটে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে। কৃচ্ছ্রসাধন সম্ভব না হলে অন্তত আর্থিক সংযম দেখাতে হবে।
সরবরাহশৃঙ্খলে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা নিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, আমাদের তথ্য-উপাত্ত বলছে, রমজান মাসের প্রয়োজনীয় পণ্যের যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ রয়েছে। আমরা জানি যে, নিত্যপণ্যের সরবরাহশৃঙ্খলে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন সিন্ডিকেট রয়েছে। নতুন সরকারি দলের নেতারা বলেছেন, তারা সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন। সরকারের প্রথম দিন থেকে আমরা সেটি দেখার অপেক্ষায় আছি।
এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কার্ড দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে, সেটা অনুসরণ করে এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে যদি দেয়া হয় তাহলে প্রকৃত বঞ্চিতরা সুবিধাভোগী হবে এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন হবে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে- স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, নির্বাচনের আগে দিলে একদিকে কার্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশঙ্কা বেশি থাকবে, অন্যদিকে কার্ড নির্ধারণের জন্য প্রকৃত ডাটার ঘাটতি থাকতে পারে। সেজন্য একটু সময় দিয়ে দিলে প্রকৃতভাবে যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পাবেন।
অনুষ্ঠানে সিপিডি’র বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর দেয়া প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমানো উচিত। কারণ, যে প্রণোদনা রেমিট্যান্সের ওপর দেয়া হচ্ছে, তা আমাদের রাজস্বের ওপরে চাপ সৃষ্টি করছে। যদি ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে এবং তার ওপর আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়া হয়, তাহলে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। এই অর্থনৈতিক চাপটা অবশ্যই আমাদের হিসাব করতে হবে।’
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এক্ষেত্রে প্রণোদনা কমানোর পাশাপাশি টাকার মূল্য বাজারভিত্তিক করা যেতে পারে। প্রবাসীরা তখন প্রতি ডলারের বিপরীতে দেশে বেশি টাকা পাবেন। ফলে টাকা কিছুটা অবমূল্যায়িত (ডেপ্রিসিয়েশন) হলে রেমিট্যান্সের প্রবাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন